Famous Flamingos

‘এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে’

১৮ই অক্টোবর, ২০১৮, সিকিম

এবারের গন্তব্য ছিল পূর্ব সিকিম। ব্রেকফাস্টে দু পিস পাউরুটি সঙ্গে মাখন আর একটা ডিমভাজা খেয়ে রওনা দিলাম জুলুক আর সিল্ক রুটের উদ্দেশে।

আমাদের কাছে ভোটার কার্ড ছিল না শুধুমাত্র আধার কার্ড ছিল। কিন্তু শুনলাম আধার কার্ড দিয়ে পারমিট হবে না। সত্যি !! এতদিন সরকার পাগল করে দিল আধার কার্ড নিয়ে। সবকিছুর সাথে নাকি আধার কার্ড লিঙ্ক হবে…খুবই গুরুত্বপূর্ণ ডকিউমেন্ট। কিন্তু কার্যকালে তো দেখছি সবই অদৃশ্য !! ভাগ্য ভালো আমার মোবাইল এ পাসপোর্টের সফট কপি ছিল। সেটা দিয়েই রংলি থেকে পারমিট নেওয়া হল।
যাবার পথে দুটো চেক পোস্ট পড়ল। প্রথমটা ছিল লিংথাম চেক পোস্ট। এখানে আমাদের কাগজপত্র দেখিয়ে আবার এগোলাম।

রাস্তায় পড়ল কিউখোলা ফলস। ছোট্ট একটা ফলস কিন্তু বেশ রূপবতী। নুড়ি পাথরের উপর দিয়ে নেচে নেচে চলেছে সে। কিছুক্ষণ ওর পাশে বসে আবার রওনা দিলাম।
হালকা জঙ্গলের রাস্তা ধরে আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলল। দুধারে সারি সারি পাইন গাছ। আবার কোথাও এলাচ ক্ষেত। এখানে এলাচের খুব চাষ দেখতে পাওয়া যায়।

এরপরের রাস্তাটা প্যাঙ্গোলাখা ওয়াইল্ড লাইফ সাংচুয়ারির অধীনে। প্রবেশমূল্য মাথাপিছু ৫০ টাকা করে দিয়ে আমাদের গাড়ি ছুটে চলল সেই বহু আকাঙ্খিত রাস্তায়। ঢুকে গেলাম রেশমি পথে ( সিল্ক রুট ) !!

চিন থেকে এই পথেই শুনেছি সিল্ক আমাদের দেশে প্রথম আসে। আর সেই কারণেই রাস্তাটার নাম ‘ সিল্ক রুট’।

‘এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে’। সত্যিই তাই ! সারি সারি মেঘ আর তার সাথে নাম না জানা পাহাড়ি গাছ আর পাথুড়ে জমি। রাস্তায় নেমে দাঁড়ালে মনে হয় শরীরের উপর দিয়ে মেঘ চলে যাচ্ছে। ফুল ছাড়া রডোডেনড্রন গাছগুলো অবাক দৃষ্টিতে যেন চেয়ে আছে আমাদের দিকে। ভীষণ রুক্ষ, পাথুরে প্রকৃতি আর তার পুরুষালি সৌন্দর্য!যেন ভ্যানগগের আঁকা ছবি !!

এক উপত্যকা থেকে আর এক উপত্যকায় মেঘগুলো লাফিয়ে লাফিয়ে চলে যাচ্ছে। কোনকিছুই গোছানো নয় সবকিছুই অগোছালো আর তাই এতো সুন্দর। প্রকৃতি যদি গোছানো হয় তাহলে তাকে বড়ো অচেনা লাগে। প্রকৃতি চলবে তার নিজের খেয়ালে। তবেই না সে স্বয়ংসম্পূর্ণ !! কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে যাচ্ছে মেঘের খেলা। কাঠের উনুনের ধোঁয়ার মতো আস্তে আস্তে ছেয়ে যাচ্ছে গাছ, পাথর আর সবশেষে আমার আত্মাকে।প্রতিটা নিশ্বাস যেন ছুঁয়ে যাচ্ছে হিমেল হাওয়া। মেঘের ঠাণ্ডা স্পর্শ অনুভব করছিলাম শরীরে, মনে, আত্মায় !!

প্রকৃতির এই পাগল করা রূপকে একটু ছুঁয়ে দেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। নেমে পড়লাম গাড়ি থেকে। সামনে মাইলস্টোনে লেখা তুকলা ৫.৬।

কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম আর দীর্ঘ নিশ্বাসে শরীরে নিলাম পাহাড়ের যৌবন !

কিছুক্ষণ পরই অনুভব করলাম বুকের হাড় ঠকঠক করে কাঁপছে ।হাতের আঙ্গুল অসাড় হয়ে যাচ্ছে ঠাণ্ডায়। তবু মন মানছিল না ছেড়ে আসতে। কিছুটা ঘোর কাটতে আবার রওনা দিলাম।

প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে দেখতে প্রায় ১৪,০০০ ফুট উপরে কখন চলে এলাম টেরও পাইনি। হঠাৎ করে উপর থেকে চোখ পড়ল নিচের দিকে। সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলে গেছে রাস্তা।


সিল্ক রুট !

রাস্তাটার একটা বৈচিত্র্য আছে শুনেছিলাম আজ চাক্ষুষ দেখলাম। সাপের মতো আঁকাবাঁকা এই রাস্তায় মোট ১৫ টি বাঁক আছে।
দুদিকে খাদ, মাঝে সাপের মতো মায়াবী রাস্তা, রাস্তার পাশে প্রচুর ছোটো ছোটো পাহাড়ি গাছ আর সেই গাছের পাতাগুলো হাওয়ায় তিরতির করে কাঁপছে ! মাঝে মাঝে পরিষ্কার মাঝে মাঝে মেঘে ঢাকা ! ভাষায় লিখে বা বলে এ রূপ বর্ণনা দেওয়া অসম্ভব। দুচোখ ভরে দেখেও আশ মেটে না। প্রতিটা নিশ্বাসে পাহাড়ের গন্ধ।

যেতে যেতে পথে পড়ল কালিপোখরি লেক। জলের রঙ কালো হওয়ায় এইরকম নামকরণ।সবশেষে পৌঁছালাম এলিফ্যান্টা লেকের সামনে।


হাতির মতো দেখতে বলেই হয়তো এর নাম এলিফ্যান্টা।

একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে ফেরবার পথে গেলাম বাবা হরভজন সিং এর মন্দিরে। এর এক মস্ত ইতিহাস আছে শুনলাম। এইখানে হরভজন সিং নামে এক সৈনিক কর্মরত অবস্থায় মারা যান। কিন্তু মারা যাবার পরও নাকি ওনার উপস্থিতি উপলব্ধি করা যায়। তিনি কোনরকম বিপদের আশঙ্কা পেলেই এখনও সৈনিকদের আগে থেকে সতর্ক করে দেন স্বপ্নে ! জুতো খুলে ঢুকতে হয় মন্দিরে। ছবি তোলা নিষিদ্ধ নয় কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া বারণ তাই এখানে আপলোড করলাম না। তাছাড়া কিছু জিনিষ শুধু দুচোখ ভরে উপলব্ধি করা উচিৎ। এই জায়গাটাও তেমনি।

মন্দিরের ঘরে টেবিলের উপর একটা খাতা আছে। সেখানে যে কেউ তার মনের বাসনা লিখে আসতে পারে। এখানকার মানুষ বিশ্বাস করেন যে, বাবাজি ডিউটি শেষ করে ঘরে এসে এই খাতাটি নিয়ে বসেন এবং খাতায় লেখা ইচ্ছেগুলো পূরণ করেন ! ‘ বিশ্বাসে মেলায় বস্তু তর্কে বহুদূর ‘! আজ এই মুহূর্তে প্রকৃতির এই রূপের মুগ্ধতা নিয়ে আমিও কিন্তু বিশ্বাস করেছি এই মানুষটার উপস্থিতি। ভাবতে ভালোলাগে এখনও যুক্তি, তর্ক, অঙ্ক, বিজ্ঞান এসবের বাইরেও কিছু জিনিষের অস্তিত্ব আছে। আছে বিশ্বাস, আছে আস্থা আর আছে প্রকৃতি !
ফিরে আসার পথে হঠাৎ মনে হল বাবাজির খাতায় ইচ্ছেটা লেখা হল না!

পরজন্ম বলে যদি কিছু থাকে তাহলে একজন্ম আমায় এই রাস্তার পাশের রডোডেনড্রন ফুল করে জন্ম দিও! মেঘের সাথে প্রেম করব চুটিয়ে ! আর ঠাণ্ডা হাওয়ায় মিশিয়ে দেবো আমার ফুলের সমস্ত নির্যাস!!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *