Famous Flamingos

অপরূপ অযোধ্যা !

‘উঠলো বাই তো কটক যাই’ এই প্রবাদ বাক্য টা বাঙালি ছাড়া অন্য কোনো জাতির সাথে খাপ খায়না।
এমনই এক হঠাৎ হুজুগ আমাদের এক অসাধারণ অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়ে থাকলো।

দিন তিনেকের প্রস্তুতিতে একটা ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান করে ফেললাম।এবারের গন্তব্য পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়।অনেকের কাছে অযোধ্যার নৈসর্গিক রূপের আখ্যান শুনেছি,গুগুল দর্শনে তার কিছুটা আন্দাজ পেলেও এবার চক্ষু কর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করতে সশরীরে হাজির হলাম অযোধ্যার মাটিতে।

‘শীতের সকালের ঠান্ডা হারল ঘোরার তাড়নায়
অযোধ্যা যে দিচ্ছে উঁকি মনের জানালায়,’

খুব ভোরে গাড়ি নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম পুরুলিয়ার উদ্দেশ্যে। ২নং জাতীয় সড়ক ধরে আসানসোল হয়ে পুরুলিয়া পৌঁছতে বেলা ১১ টা বাজলো, আরো ঘন্টা খানেক লাগল পাহাড়ের ওপর যেতে। সেখানেই হোটেল পেলাম মনের মতো পরিবেশে।
যাত্রার ক্লান্তি কে নিমেষে কাটিয়ে লাগেজ রেখেই বেরিয়ে পড়লাম প্রকৃতি দর্শনে,, তর না সওয়া মনের তাগিদে পেটের সাথে কিছুটা না-ইনসাফি করে ফেললাম। প্রায় কিছু না খাওয়া না শরীর টাও তখন অযোধ্যার নবপ্রেমে মুখচোরা।স্থানীয় কিছু মানুষ জনের কাছে আইডিয়া নিয়ে ছকে ফেললাম দুদিনের সফরসূচি।
মধ্যাহ্নে আহারে পেট কে তৃপ্ত করেই বেরিয়ে পড়লাম গাড়ি নিয়ে অনতিদূরে থাকা বিভিন্ন স্থানগুলোর উদ্দেশ্যে।
আমাদের হোটেলের খুব কাছেই ছিলো ময়ূর পাহাড়, দূর থেকে ময়ূর এর মতো দেখতে লাগায় এর এমন নাম।
প্রায় ন্যাড়া এই পাহাড় টায় সবাই মিলেই উঠে পড়লাম।পাহাড়ের মাথার ওপর থেকে চারিদিকের দৃশ্য আমাদের সব ক্লান্তি নিমেষে ভুলিয়ে দিলো।ওপর থেকে বোঝা গেলো কেনো এটাকেও জঙ্গলমহল বলে।যেদিকে চোখ যায় সুদূর বিস্তৃত সবুজের মেলা।

ছোটবড় নানান গাছের সমারোহ চোখের শান্তি প্রদান করে।
সেখান থেকে গেলাম মার্বেল লেক যার আসল নাম দুর্গবেরা ড্যাম। বিকেলের পড়ন্ত আলোতে
অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা সেখানে আমাদের গ্রাস করল।

চারিদিকে উঁচু এবড়ো খেবরো পাহাড়ের মাঝে সুন্দর শান্ত বিশাল জলাশয় অদ্ভুত মাদকতায় মন কে আবিষ্ট করে ফেলল।
জোর গলার চিৎকার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা লেগে।বয়স ভুলে নিজের মেয়ের সাথে শিশুর মত চিৎকার করে নিজের স্বরের প্রতিধ্বনি শোনার নেশায় উন্মত্ত হয়ে উঠলাম।
অবাঞ্ছিত আধাঁর সে পাগলামিতে বাঁধ সাধল।সম্বিৎ ফিরলো ড্রাইভারের সাবধানী তে।ফিরে চললাম সেদিনের মত হোটেলের উদ্দেশ্যে।
রাতে হোটেলের ব্যাবস্থায় পুরুলিয়ার বিখ্যাত ছৌ নাচ উপভোগ করার সময় মনে হচ্ছিল এর মাঝেই থেকে গেলে মন্দ হয়না।দৈনন্দিন জীবনের টানাপোড়েন থেকে বহুদূরে এসবের মাঝে নিজেকে রাখলে জীবন সার্থক।
পরের দিন বেশ সকালেই উঠে পড়লাম সকলে,এক মুহূর্তও বৃথা নষ্ট করা যাবেনা।সকালে পায়ে হেঁটে আশেপাশে ঘুরে জানলাম কদিন আগেও এসব অঞ্চল কিভাবে মাওবাদীদের মুক্তাঞ্চল ছিলো।সেই সময়ের তাদের ভয়ঙ্কর গায়ে কাঁটা দেওয়া অভিজ্ঞতা থেকে সহজেই অনুমেয় তারা কি ভীষণ কষ্টে ছিল সেই সময়কালে।
প্রাতঃরাশ করেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম নতুন এক অজানার সাথে পরিচিত হতে।আজকের গন্তব্য বামনী ফলস, তুর্গা ড্যাম, মুরুগুমা ড্যাম,আপার ড্যাম, লোয়ার ড্যাম,আর বেশ কিছু দূরের মুখোশ গ্রাম,যার স্থানীয় নাম ‘চারিদা’।প্রতিটা স্থান তার নিজ নিজ সৌন্দর্যে মুগ্ধতার দাবিদার।

বামনী ফলস এর নিচে যাওয়ার রাস্তাটার মধ্যে বেশ গা ছমছমে অনুভূতি আছে,প্রচুর জঙ্গল থাকায় পরে যাওয়ার ভয় কম,তবে জোশে নেমে গেলেও অমন চড়াই দিয়ে ওঠা টা বেশ কষ্টের।

তুর্গা ড্যামের সৌন্দর্য্য বেশ আকর্ষক।
এখানের স্বচ্ছ টলটলে জলে বোটিং করতে পারলে জীবন সার্থক হত,যদিও সেখানে তেমন ব্যবস্থা চোখে পড়লো না।

তবে সবের মধ্যে মুরুগুমার রূপের প্রেমে পড়ে গেলাম।

মুরুগুমা ড্যামের বিস্তৃতি, তার চারপাশের প্রাকৃতিক অপরূপতা স্থবির করে রাখলো অনেকক্ষন।

আমাদের রাজ্যে উত্তর বঙ্গ, দার্জিলিং বাদ দিলে পুরুলিয়ার অযোধ্যা আমার মতে সেরার সেরা।মনে একটা শপথ নিয়ে মুরুগুমা ছাড়লাম, বলে গেলাম আবার যদি কোনো দিন সুযোগ পাই এই মুরুগুমার পাশেই থাকবো ।আর সত্যি দেখলাম থাকার কটেজও আছে।

সেখান থেকে গেলাম আপার ড্যাম,লোয়ার ড্যাম দেখতে।

সেখান থেকে মুখোশ গ্রাম ‘চরিদা’ যেতে একটু বেগ পেতে হলো।আসলে গুগুল ম্যাপের ভরসা তেই আমাদের এই ভ্রমণ, কোনো সমস্যাই হয়নি কোথাও, কিন্তু এখানে চরিদা কে খুঁজে পেতে আমাদের অনেক পথ অতিরিক্ত ড্রাইভ করতে হলো।গুগুলে দেখানো জায়গা টার সাথে বাস্তবের ঠিকানার গরমিল থাকায় একটু বেশি পথ ঘুরতে হলো।বলতে দ্বিধা নেই এই অতিরিক্ত ঘোরা টা আমাদের শাপে বর হল।দিগভ্রষ্টের মতো ঘুরতে গিয়ে এমন সব সুন্দর জায়গা দিয়ে আমরা ঘুরলাম যা অবর্ণনীয়।শেষে যখন চরিদা পৌছালাম তখন সূর্য অস্তাচলে।

বেশ কিছু পছন্দের মুখোশ কে ব্যাগ বন্দি করে ফেললাম।দামেও বেশ সস্তা,দেখতেও দারুন।

সব দেখে হোটেল ফিরতে বেশ সন্ধ্যে হলো।জানুয়ারি মাসের ঠান্ডাটাও বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে।হোটেল ফিরে আমরা ক্যাম্প ফায়ার এর ব্যবস্থা করে বেশ জমিয়ে আড্ডা মারলাম।অদ্য ই শেষ রজনী এই পুরুলিয়ার মাটিতে, তাই প্রাণ ভরে সে মাটির আঘ্রান বুকে ভরতে দেরি করলাম না।দেশী মোরগের বারবিকিউ করে বেশ রাত হলো নৈশভোজ সারতে।

পর দিন সকালে প্রাতঃরাশ সেরে বেরিয়ে পড়লাম আবার ব্যস্ততার জীবনে যোগ দিতে।ফেরার পথে জয়চন্ডী পাহাড়,গরপঞ্চকোট,বরানতি,
পানচেত ড্যাম ঘুরে সোজা বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত দশ টা।

তবে ফেরার পথে শক্তিগড়ের বিখ্যাত ল্যাংচার স্বাদ নিতে ভুলিনি।
বলতে দ্বিধা নেই এই ল্যাংচার থেকেও অনেক মধুর স্মৃতি হয়ে থাকবে অযোধ্যার প্রতিটি জায়গা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *