Famous Flamingos

অযোধ্যা সফর !

মন বলল যাবি—বেড়িয়ে পড়লাম একদল যৌবনের সঙ্গে অযোধ্যা পাহাড় ,পুরুলিয়া। রাতের ট্রেন থেকে ভোর চারটে তে নামলাম ‘শুইশাতে’। বেশ অন্ধকার, চা এর খোঁজে চারদিকে তাকিয়ে দেখি হাট বসার আয়োজন চলছে। শহুরেদের চা এর হ্যাংলামো দেখে গ্রামের আকাশ দেখি লজ্জায় লাল হয়ে উঠছে। অপূর্ব সেই সূর্যোদয় আমাদের পৌঁছে দিল বাঘমুন্ডি গ্রামে, অযোধ্যা পাহাড়ের কোলে।


অযোধ্যা পাহাড়ে সূর্যোদয়

ছোটোনাগপুরের মালভূমির কিছু অংশ আছে পুরুলিয়ায়, আর তাকে ঘিরে আছে অযোধ্যা পাহাড়ের রেঞ্জ। বাঘমুন্ডি থেকে পাহাড়ে চড়া শুরু। লোয়ার ও আপার ড্যাম আসলে পাহাড়ের কোলে জলরাশিকে বেঁধে  রেখে তৈরি হয়েছে হাইড্রাল পাওয়ার  প্রোজেক্ট। ড্যামের স্বচ্ছ জলে মিশেছে আকাশ। শাল, মহূয়া, পলাশ আর নাম না জানা গাছে ঢাকা অযোধ্যা পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে গাড়িতে যেতে যেতে শুনলাম বুনোহাতি, ভাল্লুক, হরিণ আর সাপের গল্প। চারিদিকে  শুধু  জঙ্গল আর জঙ্গল, পাতা ঝরার শব্দ আর পাহাড়ের বাঁকেবাঁকে যেন রয়েছে অসীম রহস্য। তাই এক জায়গায় জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গিয়ে আবিষ্কার করলাম সুন্দরী মুরগুমা লেক-কে, দূর থেকে শুধু তার রুপেই মুগ্ধ হলাম না, কাছে গিয়ে তার জলে পা ডুবিয়ে সিগ্ধ ও হলাম।

দুপুরের আহার হল অযোধ্যা হিলটপে,দেখা হল সীতাকুন্ডু। ফেরার পথে এলাম মার্বেল রকের খাদানে। খাদানটি আসলে একটি পরিত্যক্ত খনি যা এখন নিস্তব্ধ পাথরে ঘেরা লেক, ভয় ও ভালোলাগার অনুভূতি একসঙ্গে জাগে এখানে। এখনও একটাও ঝর্না দেখলাম না মনে হতেই দেখি গাড়ি এসে দাঁড়ালো বামনী ফলসের কাছে। ঝর্ণার ঝরঝর শব্দ শুনে দুর্গম পথ ধরে এগোলাম, অবশেষে দেখা মিললো সেই অপরূপার।


বামনী ফলস

ফেরার পরে রাতের আকাশের কালপুরুষ আর ধ্রুবতারার খোঁজ করতে করতে মন তৈরি হল পরেরদিনের পলাশ অভিযানের জন্য ।

“নীল দিগন্তে ঐ ফুলের আগুন লাগলো”

বাঘমুন্ডি আর ঝালদা সমতলে বসন্তে আসে পলাশের বন্যা। সত্যি পলাশ, শিমুল, কুসুম তাদের রূপের ডালি সাজিয়ে দেয় এই সময়ে। এরই মাঝে আছে মুখোশ তৈরির গ্রাম চরিদা।

সৃষ্টিতে মগ্ন

লেকের জলে পাহাড়ের ছায়ামুখ আর পরিযায়ী পাখির ভিড় খয়রাবেড়িয়ায়, যাওয়া পুরো পথে কুলের বন। এই কুল ও কুসুম গাছে হয় লাক্ষা, যা থেকে পাই গালা।

মাঠা বনভূমি ঘিরে আছে পাখি পাহাড়। পাহাড় শুধু পাথরের স্তুপ নয়, তাকে শিল্পনিদর্শন হিসাবে তুলে ধরেছেন শিল্পী। কয়েক দশক ধরে, পাহাড়ের গায়ে পাখির চিত্র এঁকে ও খোদাই করে তৈরি হচ্ছে এই পাখি পাহাড়। কাছ থেকে দেখবো বলে এগোতে বেজে উঠলো শাল, সোনাঝুরি ও নাম না জানা গাছের পাতার মর্মর ধ্বনি ।

পাথরে খোদাই চিত্রশিল্প

ঝালদা বাঘমুন্ডির পশালবনের মধ্যে যখন নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি তখনই একটি পলাশ আমার  ক্লান্ত  ক্যামেরার উপর ঝরে পড়ে মনে করিয়ে দিল ঘরে ফেরার কথা। বানজারা ক্যাম্পের পলাশভূমির ঝরা পলাশ ও রাতের ছৌ নাচের স্মৃতি নিয়ে ফেরার পথ ধরলাম।

স্মৃতিটুকু থাক !

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *