Famous Flamingos

ষাটোর্ধেও পুরীর হাতছানি !

পুরী-বাঙালির হৃদয়ে সাড়া জাগানো ছোট্ট একটা নাম।ছেলেবেলা থেকে বহুবার গেছি; তবু জীবনের সায়াহ্নে এসেও তাকে দেখার জন্য কি আকুলতা! মাত্র একদিনের নোটিসে তৎকালে টিকিট কেটে, হাতের কাছে যা পেয়েছি, কোনমতে ব্যাগে ঢুকিয়ে বেরিয়ে পড়লাম পুরীর উদ্দেশ্যে। পিছনে পড়ে রইল সংসারের প্রাত্যহিকী।

ট্রেন পৌঁছল ভোর ৫টায়। ভোরের তাজা হাওয়া আগের দিনের অতিব্যস্ততা ও ট্রেনের বিনিদ্র রজনীর সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দিল। স্টেশন চত্বর থেকে বেরিয়ে অটো নিয়ে চললাম ‘পার্ক বিচ রিসর্ট’ হোটেলের দিকে।

রাস্তার শেষ বাঁক ঘুরতেই চোখে-মুখে এসে লাগল ঠাণ্ডা নোনা বাতাস। রোমাঞ্চিত হল সারা শরীর। আর একটু এগোতেই দৃশ্যমান হল সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত অগাধ, অসীম জলরাশি।

বুকের ভেতর উন্মাদনা অনুভব করলাম। ভোরের হালকা আলোয় তখন আকাশ আর সমুদ্র একাকার। আরও কাছে যেতেই সমুদ্রের অস্থির, চঞ্চল রূপ প্রতিভাত হল…… বিশাল বিশাল ঢেউ যেন মাথা কুটছে বালিতটে।

বিচের সামনেই ছিল হোটেল। লাগেজ ঘরে রেখেই বেরিয়ে পড়লাম।কী এনার্জি আমার ওইটুকু নাতনির! ওর তাড়াতেই বিশ্রাম নেওয়া গেল না। অবশ্য বিচে চা-পানের ইচ্ছাকেও উপেক্ষা করতে পারিনি।

সেখানে গিয়ে দেখলাম অত সকালেই আমাদের মতো অসংখ্য পর্যটকের ভিড়। আরও এগোলাম। কিছু বোঝার আগেই একটা বিশাল ঢেউ এসে আমাদের অতিক্রম করে পিছন দিকে চলে গেলো। শিহরিত হলাম।নাতনি চিৎকার করে উঠল………ভয় পেল নাকি!

ওমা,দেখি তারও চোখে-মুখে বিচ্ছুরিত আনন্দ। ভয় তো দূরের কথা, বাবা-মায়ের হাত টেনে আরও সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যেতে চায় সে ! 

এবার শুরু হল তার প্রশ্ন…“ এতো জল কোথা থেকে এল?…ঢেউ কে তৈরি করেছে?… ঢেউ আমাদের পায়ের কাছে হামাগুড়ি দিচ্ছে কেন?… নৌকারা কোথায় যাচ্ছে?… এখানে হাঁস নেই কেন?…যেখানে সমুদ্র শেষ সেখানে কী আছে? ”

ঢেউ-এর হাতছানি আর উপেক্ষা করা গেল না। নাতনিকে নিয়ে দুই দাদু হোটেলে ফিরে গেল। মেয়ে, জামাই, আমি আর বেয়ান পায়ে পায়ে আরও এগোলাম। দুটো বড় ঢেউকে বেশ সামলে নিলাম। মনে ভরসা এল, এখনও লড়তে পারি।

মাঝে মাঝে ঢেউ-এর ধাক্কায় পড়েও গেছি, আবার উঠে দাঁড়িয়ে লাফালাফি করেছি, টিন এজারদের মতো হাহা করে হেসেছি। ঈশ্বরের অপার করুণা– সমুদ্রের বুকে এক দেড় ঘণ্টা হুড়োহুড়ি করার ক্ষমতাটুকু এই বয়েসে রাখতে পেরেছি।

জগন্নাথদেবের মন্দিরের চূড়া থেকে বিকেলে ধ্বজা নামানোর পরিবেশ অতীব চিত্তাকর্ষক। সেই সুন্দর পরিবেশের সাক্ষী রইলাম আমরাও। সন্ধ্যায় মন্দিরে পুজো দিয়ে, আরতি দেখে আবার ফিরলাম সমুদ্র সৈকতে। প্রতিশ্রুতি রাখতে কনিষ্ঠাটিকে উটের পিঠে চড়িয়ে ঘোরানো হল। অতি অল্পসময়ের নিঁখুত পরিকল্পনায় ছিল ‘কাকাতুয়া’র খাজা কেনা। তাও ভুলিনি।

সাগর সম্মুখে মরুরাজ

পরদিনই ফিরতে হবে। অন্ধকার থাকতেই ঘুম ভেঙে গেল। মন খারাপ,চলে যাব আবার সেই প্রতিদিনের রোজনামচায় প্রবেশ। ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালাম। ক্রমশ চারিদিক ফর্সা হল, সমুদ্রের বুক থেকে সূর্যের আত্মপ্রকাশ ঘটল। সেই দৃশ্য দেখে বার্ধক্যেও যৌবনের সেই মাদকতা অনুভব করলাম।

ব্রেকফাস্ট সেরে স্টেশানের দিকে রওনা হলাম। বারবার চোখ যাচ্ছিল নীল জলরাশির দিকে। মনে হল, ঢেউগুলো কেমন যেন বিমর্ষ, তাদের দাপট যেন কমে গেছে। তাই ওদের আশ্বস্ত করে বললাম- আমি আ-বা-র আসব………!!

ক্ষণে ক্ষণে মনে মনে শুনি অতল জলের আহ্বান !

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *