Famous Flamingos

‘কেরালা-এক নৈসর্গিক রূপকথার দেশ’ ( অন্তিম পর্ব )

 

(https://www.famousflamingos.com/gods-own-country-kerala-part-1/ blog এর পর )

পরের দিন সকাল ৯টার মধ্যে আমাদের গাড়ি রওনা দিল পেরিয়ারের (ব্যাঘপ্রকল্প) উদ্দেশ্যে৷ কেরালা রাজ্যের ইডুক্কি জেলার অন্তর্গত এই পেরিয়ার (মুন্নারও এই জেলায় অবস্থিত) ৷ ওইদিন রাতে ওখানকার সরকারি গেষ্ট হাউসে আমাদের থাকার বন্দোবস্ত হয়েছে৷ আগে কোনদিনও কোথাও জঙ্গলের মধ্যে থাকিনি,না জানি সেটা কত রোমাঞ্চকর একটা ব্যাপার!! এইসব ভাবতে ভাবতে গাড়ি করে চলেছি৷

পথের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিতে গেলে পুঁজি বেড়ে যাবে,তবুও যতটা বলা দরকার আমি বলছি৷ যে রাস্তা দিয়ে আমরা চলেছি সেই রাস্তা নতুন করে তৈরি করা হচ্ছে৷ মাসখানেক আগের প্রবল বন্যার ছাপ সেই রাস্তার ওপর এখনও সুস্পষ্ট৷ একপাশে পাথর ভাঙার কাজ তখনও চলছে৷ কিন্তু ধ্বংস ও সৃষ্টির মাঝেও এখানে প্রকৃতি দেবতার রূপের কোন খামতি নেই৷ কখনও পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা পাগলাঝোরা কখনও দুরের পাহাড়ে চা বাগানের গালিচা,আবার কখনও আমাদের গাড়িকে জংলী হাতির মত ঘিরে ধরা পেঁজা তুলোর মত মেঘ এক মুহূর্তের জন্য আমাদের জানলা থেকে চোখ সরাতে দিচ্ছে না৷ আরো দূরে দেখা যাচ্ছে এঁকেবেঁকে চলে যাওয়া পেরিয়ার লেক,ওইখানে আমাদের গন্তব্য |

পেরিয়ার লেক

একটা সময় আমাদের গাড়ি মূল পাকা রাস্তা থেকে বাঁদিকে বাঁক নিয়ে একটি জায়গায় এসে থামল। জায়গাটি একটি ছোট্ট বাগানের মত,একদিকে ঝোপ-জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সরু পথ চলে গেছে,তারই একপাশে একটা জিপ গাড়ি রাখা আছে। ড্রাইভারজি বললেন এখানে হাতি চড়ার ব্যবস্থা আছে,আমরা ইচ্ছে করলে চড়তে পারি। দলের বাকি সদস্যরা অনিচ্ছা প্রকাশ করায় আমি আমাদের দলের সবথেকে ছোট সদস্য কে নিয়ে চললাম হাতি চড়তে (খরচা জনপ্রতি 500 টাকা )।

প্রথমে সেই জিপে গিয়ে বসলাম আমরা,জিপ সরু পথ ধরে আমাদের নিয়ে যেতে লাগল। মিনিট খানেক বাদে আমরা যেখানে গিয়ে পড়লাম,সেখানে সার দিয়ে ৭-৮ টা হাতি দাঁড়িয়ে আছে। তার মধ্যে থেকে একটিকে নিযুক্ত করা হল আমাদের জন্য।গজরাজ দুলকি চালে আমাদের নিয়ে চলল গ্রাম্য মেঠো পথ দিয়ে।কিছুক্ষণ পর যেখান থেকে উঠেছিলাম গজরাজ আমাদের সেখানেই নামিয়ে দিল। আমরা আবার জিপে করে পৌঁছলাম আমাদের গাড়ির জায়গায়।

 গাড়ি নিয়ে চললো পেরিয়ার এর উদ্দেশ্যে | আধঘন্টা পর পেরিয়ারের মূল গেট দিয়ে যখন আমাদের গাড়ি ঢুকছে তখন প্রায় দুপুর ৩ টে বাজতে যায়। মূল গেটের পাশেই টিকিট কাউন্টার। যদি আগে থেকে টিকিট কাটা থাকে তাহলে টিকিট কাউন্টারে টিকিট কাটতে হবে না (টিকিট অনলাইনেও পাওয়া যায়)।

পেরিয়ার এর মধ্যে দিয়ে যখন আমাদের গাড়ি যাচ্ছে, তখন রাস্তার একপাশে দেখলাম গাধার মতো দেখতে কিছু প্রাণী ঘাস খাচ্ছে। প্রাণীটাকে বলা হয় সম্বর ।খানিক পর আমাদের গাড়ি এসে থামল পেরিয়ার হাউসের সামনে। খিদেতে তখন সবারই পেট চুঁইচুঁই করছে। ঘরে গিয়ে জিনিসপত্র রেখে দুপুরের খাবার খেয়ে আবার আমাদের বেরিয়ে পড়তে হল।

তবে এর মধ্যে একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম,আমাদের ঘরের জানলায় লেখা ;’Beware of Monkeys. Don’t open this window ‘ বুঝলাম  আমাদের পূর্বপুরুষের উৎপাত এখানে ভালই ! এই বৃত্তান্ত এগোনোর আগে আমাদের হোটেলের বর্ণনাটা একটু দিয়ে রাখি।

পেরিয়ার হাউস

হোটেলটা পুরোপুরি জঙ্গল বেষ্টিত।সামনে বাচ্চাদের জন্য তৈরি করা একটা পার্ক আছে। একপাশে জাল দিয়ে সীমানা নির্দেশ করে দেওয়া আছে। সীমানার মধ্যে কদাচিৎ হাতি এসে পড়ে। আমরা এগিয়ে চললাম পেরিয়ার লেকের দিকে বোটিং করার জন্য। টিকিট আগে থেকেই কাটা ছিল আগেই জানিয়েছি (যেসব পর্যটকেরা জঙ্গলের বাইরে হোটেল বুক করবেন তারা এখানে এসেও বোটিং এর জন্য টিকিট বুক করতে পারেন)। দুধারে ঘন জঙ্গল,আর মাঝখান দিয়ে পিচ রাস্তা চলে গেছে। সেই রাস্তা ধরেই আমরা হাটতে লাগলাম।

চারপাশের পরিবেশ খুব নিস্তব্ধ। মাঝে মাঝে মৃদুমন্দ বাতাসে পাতার মর্মর ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। বেশ কিছুটা হাঁটার পর আমরা গিয়ে পড়লাম বোটিং জেটিতে । সেখানে পরপর তিনটি স্টিমার নোঙর করা আছে । অন্যান্য অরণ্যে জিপ সাফারীর ব্যবস্থা থাকে,এখানে জিপ সাফারীর এর বদলে আছে বোটিং (সারাদিনে পাঁচটি সময় আছে বোটিং করার | 7:30 am , 9:30 am , 11:15 am , 1:45 pm , 3:30 pm ) ।আমরা গিয়ে বসলাম স্টিমারের ভেতর।

পেরিয়ার লেক

স্টিমারগুলো এমনিতে খুব খোলামেলা,ভিতরে সবাই বসে থাকলেও চারপাশের দৃশ্য খুব ভালো ভাবেই দেখা যায়। তিনটি স্টিমার ভর্তি হয়ে গেলে তিনটি একসঙ্গে ছেড়ে দিল। পেরিয়ার লেকের বুক চিরে এগিয়ে চলল আমাদের স্টিমার |পাশে ঘন জঙ্গল। মনে মনে প্রার্থনা করতে লাগলাম যদি কোন প্রাণী লেকের জল খেতে আসে,তাহলে এই সুযোগে তাকে দর্শনটাও হয়ে যাবে। কিন্তু হায় মন্দ ভাগ্য!!!

১:৩০ ঘন্টা ধরে পেরিয়ার লেক চষে ফেলার পরেও কোন প্রাণীকে জল খেতে আসতে দেখলাম না লেকের পাড়ে। কিন্তু তাতে কি!! নাইবা দেখতে পেলাম কোন জীব জন্তু,ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বোটিং করা এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

বোটিং করে যখন হোটেলে ফিরছি তখন আস্তে আস্তে সন্ধ্যা হয়ে আসছে। ঘন জঙ্গলে তখন ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকতে আরম্ভ করে দিয়েছে। মনে হতে লাগলো এই বুঝি জঙ্গলের ভেতর থেকে কোন দামাল হাতি অথবা কোন বাঘ মামা এসে আমাদের পথ আটকে দাঁড়ালো। ভেবেছিলাম জঙ্গলের বাইরে থেকে কিছু কেনাকাটা করে হোটেলে ফিরব। কিন্তু জঙ্গলের মূল ফটক ৬:৩০ টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। একবার জঙ্গল এর বাইরে গেলে ফিরতে দেরি হয়ে যেতে পারে এই ভেবে একেবারে হোটেলে ফিরে গেলাম।

সেইদিন সন্ধ্যাটা পুরোটাই গেস্ট হাউসে কাটিয়ে দিতে হলো | পরদিন সকাল ৫টার মধ্যে ঘুম থেকে উঠে পড়লাম। আগে থেকে স্থির করাই ছিল জঙ্গলে ভোর হয় কিভাবে সেটা দেখব। গায়ে একটা জ্যাকেট চাপিয়ে বেরিয়ে পড়লাম মর্নিং ওয়াক করতে। সদ্য ভোর হওয়া পরিবেশ,চারপাশে সিমসিমে ঠান্ডা, শিশির ভেজা পাতা থেকে টুপটাপ করে জল পড়ার শব্দ – সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত মায়াবী জগৎের সৃষ্টি করেছে !! এই মায়াবী পরিবেশে জঙ্গলের পিচ রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর গেলাম | পাখির কলতান শোনা ছাড়া আর কোন জীব জন্তু কে দেখতে পেলাম না | এই ভোর বেলায় হয়তো সবাই ঘুমোচ্ছে!!! বেশিক্ষণ বাইরে থাকতে পারলাম না | কারণ হোটেলে ফিরেই আমাদের দিতে হবে আলেপ্পির এর উদ্দেশ্যে ।

গেস্ট হাউসে ফেরার পথে দেখলাম গেস্ট হাউসের আশেপাশের কয়েকটা গাছের শাখা কান্ড গুলিতে কয়েকটা প্রাণী ঘুমিয়ে আছে। প্রাণী গুলোর নাম নীলগিরি লঙ্গুর ।গেস্ট হাউসে ফিরে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম আলেপ্পির উদ্দেশ্যে। পিছনে পড়ে রইলো এক মায়াবী অরণ্য !!

কেরালা ভ্রমণের সময় পর্যটকরা যদি পেরিয়ারে দুটো রাত্রি থাকতে পারেন তাহলে আরো বেশি ভালো লাগবে। যাই হোক আমরা চললাম আলেপ্পির উদ্দেশ্যে। পেরিয়ার থেকে আলেপ্পি (Aleppy) বা আলফুজার (Alappuzha) দূরত্ব ১৪০ কিমি। আরব সাগরের তীরে অবস্থিত এই অঞ্চল মূলত কয়াল (Backwater, স্থলভাগ দ্বারা আবদ্ধ এবং একদিক সমুদ্রে উম্মুক্ত লবণাক্ত জলের হ্রদকে উপহ্রদ বা লেগুন বলে | কেরল রাজ্যের মালাবার উপকুলের উপহ্রদ গুলিকে কয়াল বলে ) এবং কয়ালের উপর সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা হাউসবোটের জন্য বিখ্যাত |

হাউসবোট এর ব্যাপারে আমরা অল্পস্বল্প সবাই জানি। একটা আস্ত বাড়ির মত দেখতে চলমান নৌকা বা বজরাকে বলা হয় হাউসবোট। কাশ্মীরেও অনেকটা এরকম দেখতে ডাল লেকের উপর একটি নৌকা দেখতে পাওয়া যায়,সেগুলোকেও হাউসবোট বলা হয়। কিন্তু কাশ্মীরের হাউসবোট জলের উপর স্থির অবস্থায় থাকে । এটাই হলো কাশ্মীর আর কেরালার হাউসবোট এর মধ্যে তফাৎ।

পথের বর্ণনা আর নতুন করে দিলাম না। কারণ কেরালার পথের বর্ণনা দিতে গেলে বিশেষণ কম পড়ে যাবে। যদিও এইবার যাত্রাপথ ছিল বেশিরভাগই শহরকেন্দ্রিক। আমাদের গন্তব্য ছিল Back Water -এর উপর ভাসমান। গন্তব্য তখন আর বেশি দূরে নেই ,আমরা যে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম তার ডান দিকে গ্রাম আর বাঁ দিকে বিস্তীর্ণ Back Water। Back Water র ওপর স্থানে স্থানে দ্বীপ আছে এবং দ্বীপের উপরে কিছু বাড়িও আছে লক্ষ করলাম। আবার বেশ কিছু জায়গায় বাড়ির কাছাকাছি হাউসবোট আছে দেখলাম। দুটো কে পাশাপাশি দেখে খুব মজা লাগলো।

জলের হাউস যেন দ্বীপের হাউসকে বলছে তুমিও বাড়ি আমিও বাড়ি ,তফাৎ শুধু পাল তোলায়!! বেশ কিছু জায়গায় দেখলাম এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপে যাওয়ার জন্য সেতু তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে কংক্রিটের জঙ্গল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা এক শান্ত জগৎ, জীবনের জটিলতার নিরাময় হয়তো এখানেই, এসব কারণের জন্যই কেরালার উপাধিটা (ঈশ্বরের নিজের দেশ ) সার্থক। এসব দেখতে দেখতে প্রায় কুড়ি মিনিট পর আমরা একটা বড় গেটের সামনে এসে দাঁড়ালাম।

 জায়গাটিকে হাউসস্টেশান বলা ভালো৷ একদিকে অফিস,অন্যদিকে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা হাউসবোট ।সব হাউসবোট  যে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে এমন নয়,বহু হাউসবোট  আড়াআড়ি দাঁড়িয়ে আছে একটার সঙ্গে অন্যটা লাগোয়া হয়ে৷ এই হাউসবোট  গুলোতে যেতে হলে তার আগে দাঁড়ানো অন্য হাউসবোট  গুলোর মধ্যে দিয়ে যেতে হয়৷ একটি হাউসবোট  থেকে অন্যটিতে যাবার মাধ্যম হল একটি নাতিচওড়া কাঠের পাটাতন৷

আমরা অফিসে গিয়ে যাবতীয় নিয়মকানুন শেষ করে আমাদের জন্য নিযুক্ত হাউসবোটের দিকে যাত্রা করলাম৷ অন্য ৩টি পেরিয়ে  আমাদের হাউসবোট  এ এসে যে জায়গায় পৌঁছলাম সেটি একটা ডাইনিং রুম। বোটের ডেকটাকে  সুসজ্জিত করে ডাইনিং রুম বানানো হয়েছে৷ ডাইনিংরুমের মাঝখানে একটা ডাইনিং টেবিল সেট রাখা আছে, আর দুপাশে কাঠের বেঞ্চ বানানো আছে যাতে বোট চলার সময় যাত্রীরা এখানে দুপাশের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে৷ ডাইনিং রুমের পরে আছে চারটে ঘর৷ প্রথম দুটি বেড্রুম আমাদের নিযুক্ত করা হয়েছে৷ তৃতীয় বেড্রুমটি এই বোটের কর্মচারীদের জন্য, আর চতুর্থ ঘরটি রান্নাঘর৷ ডাইনিং রুম থেকে রান্নাঘর পর্যন্ত যাবার টানা বারান্দা আছে৷ এখানকার সমস্ত হাউসবোটগুলোই মোটামুটি এই নকশায় বানানো৷

আমরা যখন হাউসবোটে এসে পৌঁছেছি তখন বেলা দুটো বেজে গেছে। মালপত্র নিজেদের ঘরে রেখে এসে আমরা তাই ডাইনিং টেবিলে বসলাম। বোটের কর্মচারীরা আমাদেরকে লাঞ্চ পরিবেশন করতে লাগল। কলকাতা থেকেই স্থির হয়েছিল যে আমাদের এই দিন দুপুরে এখানকার নিজস্ব খাবার পরিবেশন করা হবে। ভাত,সম্বর ডাল,কারিমিন মাছ (Karimeen Fish, Original Name: Green Chromide, ভারতবর্ষের দক্ষিণ এবং শ্রীলঙ্কায় এই সামুদ্রিক মাছটি পাওয়া যায় | কেরালায় এই মাছের আঞ্চলিক নাম কারিমিন) সহযোগে লাঞ্চে পেট ভরল বটে কিন্তু মন ভরল না।

লাঞ্চ সেরে আমরা এসে বসলাম বোটের সেই বেঞ্চগুলোতে। কিছুক্ষণ পর বোট রওনা দিল বিখ্যাত ভেম্বনাদ কয়ালের উদ্দেশ্যে। গ্রাম ও নারকেল গাছের সারি কে দুপাশে রেখে জলের উপর দিয়ে আমাদের হাউসবোট এগিয়ে যেতে লাগল।এখানে একটা ছোট্ট কথা বলে রাখা দরকার, কেরালায় প্রচুর নারকেল গাছ থাকা সত্ত্বেও ওখানে ডাবের দাম চল্লিশ টাকার কম কোথাও পাইনি | আসলে কেরালা রাজ্যে ডাবের চল কম। এখানে প্রধানত নারকেল টাকে ব্যবহার করা হয় তেল তৈরির কাজে। কেরালা রাজ্যের এটাও অন্যতম প্রধান ব্যবসা।

হাউসবোট

যাই হোক বিকেলের পড়ন্ত রৌদ্রে মৃদুমন্দ বাতাসে হাউসবোট এগিয়ে চলেছে তার নিজের ছন্দে।মাঝে মাঝে জলের উপর দাঁড়িয়ে থাকা অন্য হাউসবোট গুলো চোখে পড়তে লাগলো। একেকটা হাউসবোট এক এক রকমের দেখতে। কোনটা একতলা,কোনটা দোতলা,আবার কোনটাতে দোতলার সঙ্গে ব্যালকনি। আরো এক রকমের বোট এখানে চোখে পড়ল,যাকে বলা হয় কায়াক (Kayak)।এই বোটগুলো সাধারণত এখানকার স্থানীয়রা ব্যবহার করেন এক পার থেকে অন্য পারে যাওয়ার জন্য|

জলে সিগাল,পানকৌড়ি প্রভৃতি পাখি চরে বেড়াচ্ছে,স্থানীয়রা পাড়ে বসে গল্প করছে,কেউ আবার মাছ ধরছে-সব মিলিয়ে সত্যই এক অন্য জগত!! এভাবে বেশ কিছুক্ষন চলার পর একটা সময় আমরা ভেম্বনাদ কয়ালে গিয়ে পড়লাম।

সেখানে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে আমরা গেলাম পাড়ের এক স্থানীয় বাজারে। সেখান থেকে আমরা রাত্রের পেট পুজো করার জন্য চিংড়ি মাছ কিনে বোটে উঠলাম। বোট আবার ফিরে চলল যথাস্থানে। খানিক পর ওই কয়ালের একটা পাড়েই আমাদের বোট ভিড়ল। ততক্ষনে প্রায় সন্ধ্যে নেমে গেছে।

হাউসবোট থেকে দেখা সূর্যাস্ত

সেদিন আবার কোজাগরী পূর্ণিমা। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। নিস্তব্ধ আঁধার পরিবেশে সেই আলো প্রতিফলিত হচ্ছে কয়ালের জলে। সত্যি সে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা- যা ঠিক ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। সন্ধ্যেবেলা আর করার কিছু নেই ,তাই ডেকে বসে নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করেই কাটিয়ে দিলাম।

একটা সময় রাত্রের খাবার চলে এল। কেরালা আসা অব্দি খাওয়া-দাওয়া টা খুব একটা মনঃপূত হচ্ছিল না। কিন্তু সেই দিন রাত্রে রুটি -মাংস- চিংড়ি মাছ সহযোগে খাওয়াটা হলো চমৎকার। পরদিন সকাল সকাল আমাদের রওনা দিতে হবে কন্যাকুমারী,যার দূরত্ব আলেপ্পি থেকে ২৬৪ কিমি। তাই তাড়াতাড়ি খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়তে হল |

পরদিন সকাল আটটার মধ্যে ব্রেকফাস্ট খেয়ে রওনা দিলাম কন্যাকুমারীর উদ্দেশ্যে (কন্যাকুমারী ভ্রমণ এর বর্ণনা আছে আমার কিংবদন্তি কন্যাকুমারী ব্লগটিতে | Link:https://www.famousflamingos.com/kinbodonti-kanyakumari/ ) | কন্যাকুমারী তে এক রাত কাটিয়ে আমরা পরের দিন রওনা দিলাম আমাদের ভ্রমণ পর্বের শেষ স্থান – কোভালাম এর উদ্দেশ্যে,যার দূরত্ব কন্যাকুমারী থেকে ১০০ কিলোমিটার।

কন্যাকুমারী যাওয়ার সময় আমরা কোভালামের উপর দিয়েই গিয়েছিলাম।কন্যাকুমারী থেকে কোভালাম আসার সময় আমরা একবার মাত্র নামলাম সুচিন্দ্রম মন্দির দেখার জন্য | আরব সাগরের তীরে অবস্থিত কোভালাম কেরালার এক শহর। কোভালাম সমুদ্র সৈকত হলো ভারতবর্ষের অন্যতম  বিখ্যাত একটি সমুদ্র সৈকত |

আমরা যখন আমাদের বরাদ্দ হোটেল পৌঁছলাম তখন বেলা দেড়টা বেজে গেছে। তাই সেইদিন আর সমুদ্র স্নান হলো না। হোটেলে স্নান খাওয়া সেরে নিলাম। এই হোটেলে এসে দুটো ব্যাপার খেয়াল করলাম। প্রথমটি হলো এই হোটেলে দেখলাম প্রচুর বিদেশি পর্যটক এসে উঠেছেন। আর দ্বিতীয়টি হলো এই হোটেলে নিজস্ব সমুদ্র সৈকত আছে। হোটেলের নিজস্ব সমুদ্র সৈকত ব্যাপারটা আর কিছুই নয়,হোটেলের পিছন দিকে সিঁড়ি নেমে গেছে সমুদ্র সৈকতের দিকে।

সৈকতটিকে পাথর দিয়ে ঘিরে একেবারে আলাদা করে রাখা হয়েছে,কেবলমাত্র যারা এই হোটেলে থাকবেন তারাই এই সমুদ্র সৈকত টি ব্যবহার করতে পারবেন। খাওয়া-দাওয়া সেরে আধ ঘন্টা আমরা ঐ সমুদ্র সৈকতে সময় কাটালাম। তারপর হোটেলে ফিরে এসে ঘন্টা দুয়েক ভাতঘুম দিয়ে বিকেলে রওনা হলাম কোভালাম সি-বিচ এর উদ্দেশ্যে।

আমাদের হোটেলের সামনে দিয়ে একটি পাথরের ঢালু রাস্তা নেমে গেছে, সেই রাস্তা দিয়ে মিনিট পাঁচেক হাঁটলেই কোভালাম বিচে ওঠা যায়।এই সৈকতটি কে লাইট হাউস বীচও বলা হয়। আমার যখন সৈকতে এসে পৌঁছলাম তখন সূর্যাস্ত হয়ে গেছে,কিন্তু দিগন্ত রেখায় সূর্যের শেষ আলোক ছটা তখনও দেখা যাচ্ছে। সৈকতটি এমনিতে বেশ বড়,একদিকে বড় বড় পাথর ও লাইট হাউজ দিয়ে ঘেরা এবং অন্য দিকটি পুরোপুরি খোলামেলা,যতদূর হাঁটতে চাওয়া যায় হাঁটা যায়। আমায় সৈকতে বসে কিছুক্ষণ সময় কাটাবার পর,সৈকত বরাবর পাথুরে রাস্তায় হাঁটতে লাগলাম।

লাইটহাউস বীচ

রাস্তার একপাশে হরেক মালপত্র যথা: শাড়ি-ধুতি ,মশলাপাতি,হাতের তৈরি শিল্প সামগ্রী ইত্যাদি সাজিয়ে নিয়ে বসেছে ব্যবসায়ীরা, কিন্তু সব থেকে বেশি যেটা চোখে পড়লো সেটা হচ্ছে খাবারের দোকান। আরো একটা জিনিস চোখে পড়লো,এখানে ভারতীয় পর্যটকদের তুলনায় বিদেশী পর্যটকের সংখ্যা অনেক বেশি। খাবারের হোটেল গুলোতে তারাই বেশিরভাগ স্থান দখল করে আছে। সামগ্রিকভাবে সমুদ্র সৈকতটি একেবারেই জমজমাট কোলাহলপূর্ণ নয়,খুব শান্ত। আর সেই কারণেই এই স্থানটি বিদেশীদের কাছে এত পছন্দের। আর ঠিক এই কারণেই এই সমুদ্র সৈকতটি  বাঙালি পর্যটকদের কাছে খুব একটা পছন্দের নাও হতে পারে কারণ আমরা বাঙালিরা এমনিতে জমজমাট কোলাহলপূর্ণ ব্যাপারটাকে খুব পছন্দ করি। ( তাই জন্যই বোধহয় বাঙ্গালীদের ‘ দী-পু-দা ‘খুব পছন্দের জায়গা।) সেই তুলনায় এই সমুদ্র সৈকতটি একেবারেই নিরিবিলি। কোভালাম বিচে অনেকক্ষণ সময় কাটানোর পর আমরা হোটেলের ফিরে এলাম |

পরদিন সকালে বেশ তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে পড়তে হলো। আমাদের ভ্রমণ পর্বের শেষ দিন বলে কথা ,এখনো বেশ কিছু জায়গা দেখা বাকি। ব্রেকফাস্ট খেয়ে আমরা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম পদ্মনাভস্বামী মন্দিরের (মন্দির দর্শনের সময় :- সকাল: 03.30 am – 04.45 am , 06.30 am – 07.00 am , 08.30 am – 10.00 am , 10.30 am – 11.10 am ,11.45 am -12.00 Noon , সন্ধ্যা: 05.00 pm – 06.15 pm , 06.45 pm – 07.20 pm ) উদ্দেশ্যে। এই মন্দিরটি ত্রিভান্দম বা তিরুবন্তপুরমে (কেরালা রাজ্যের রাজধানী এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর ) অবস্থিত যা আমাদের হোটেল থেকে ১১ কিলোমিটার দূরে।


পদ্মনাভস্বামী মন্দির

কেরালা-দ্রাবিড়ীয় স্থাপত্যে তৈরি এই প্রাচীন মন্দিরটিতে পৃথিবীর সবথেকে সোনা আছে বলে অনুমান করা হয়। বলা হয় এই মন্দিরের কিছু গুপ্ত কক্ষ এখনো খোলা যায়নি,সেগুলি খোলার উপায় কারোরই জানা নেই। এই মন্দিরে পুজো দিতে গেলে পুরুষদের খালি গা ও ধুতি এবংমহিলাদের শাড়ি অবশ্যই পরতে হবে । আমরা যখন এই মন্দিরে পৌঁছলাম তখন সাড়ে নটা বাজে। পোশাক পরিবর্তন করে, ডালা কিনে আমরা মন্দিরে ঢুকলাম। মন্দিরটি যে প্রাচীন তা দেখেই বোঝা যায়। মূল মন্দিরটি চারপাশে দালান দ্বারা বেষ্টিত। আমরা যখন মূল মন্দিরের ঢুকলাম তখন সেখানে খুব একটা বেশি ভিড় ছিল না।মূল মন্দিরের তিনটি দরজা, ভিতরে পিদিম জ্বলছে। সেই পিদিমের আলোতে দেখতে পেলাম সোনায় মোড়া ভগবান পদ্মনাভস্বামী কে। একটি হাত প্রসারিত করে অনন্ত শয্যায় শয়ান তিনি। তিনটি দরজা দিয়ে যথাক্রমে ওনার মাথা , নাভি এবং পদযুগল দেখা যাচ্ছে, বলা হয় তিনটি দরজা দিয়ে দর্শন করলে তবেই নাকি দর্শন সম্পূর্ণ হয়। মন্দির দর্শন করে আমরা গাড়িতে উঠলাম। এরপর আরো কিছু জায়গা যেমন, তিরুবন্তপুরম চিড়িয়াখানা,জাদুঘর প্রভৃতি জায়গা দেখে আমরা ফিরে এলাম আমাদের হোটেলে।

শেষ দিন বলে কথা,একটু সমুদ্র স্নান না করলে কি চলে!! তাই হোটেলে ফিরে পোশাক পরিবর্তন করে সটান নেমে গেলাম সমুদ্রে।ঘন্টাখানেক ধরে চলল সমুদ্রে দাপাদাপি। এখানকার সমুদ্রে স্নান করতে গিয়ে বুঝলাম আরেক ঝামেলা এখানে আছে , সেটা হচ্ছে জেলিফিশের উৎপাত। সমুদ্রের জলে একসঙ্গে এত জেলিফিশ আমি এর আগে কখনো দেখিনি,ঠিকভাবে সমুদ্র স্নান করাই দায়। তখন প্রায় বেলা দুটো বাজে, আমরা সমুদ্র স্নান শেষ করে দুপুরের খাবার খেতে বসলাম।

সমুদ্র স্নান এর ফলে খিদেও পেয়েছিল তাই খেলামও প্রচুর। হোটেলের ঘরে ফিরে এসে সারাদিন আর কোন কাজ ছিল না লাগেজ গোছানো ছাড়া। ভ্রমণ পর্বের শেষ দু একটা দিনে বাড়ির জন্য খুব মন টানছিল,কারণ যতই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য – হোটেলের বৈভব থাকুক না কেন ,দিনের শেষে পাখিকে  তো নিজের বাসায় ফিরতে হবে !

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে স্নান করে ,জল খাবার খেয়ে ৮:৩০টার মধ্যে আমরা বেরিয়ে গেলাম তিরুবন্তপুরম এয়ারপোর্ট এর উদ্দেশ্যে।পিছনে পড়ে রইল এক অনাবিল সুন্দর অভিজ্ঞতা,যার কথা আমি লিখতে বসে আজও যেন কোথাও হারিয়ে যাচ্ছি। ৯টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম এয়ারপোর্টে। ১০:৩০টার ফ্লাইট ধরে চেন্নাই,চেন্নাই থেকে ২:৪৫ টার ফ্লাইট ধরে যখন কলকাতা পৌঁছলাম তখন বাজে ৫:৩০টা |মহানগরীর আকাশে তখন সন্ধ্যা নামছে একটু একটু করে!!

 পর্যটকদের জন্য কিছু কথা :

কেরালা -কন্যাকুমারী ভ্রমণের জন্য নির্ধারিত দিন :

১০-১২ দিন কেরালা -কন্যাকুমারী ভ্রমণের খরচ : ২০০০০-৩০০০০ টাকা ( যাতায়াতের মাধ্যম,হোটেল ভাড়া,দিনের তারতম্যে খরচের তারতম্য হবে ) ক্রয় করার মত দ্রব্য : চা -কফি, চকলেট ,মশলাপাতি ,কাঠের তৈরি দ্রব্য , কেরালা কটনের শাড়ি অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে সঙ্গে যদি খাবার কষ্টটা একটু মানিয়ে নিতে পারেন তাহলে কেরালা সত্যিই অসাধারণ একটি জায়গা | আমরা কেরালা গিয়েছিলাম কেরালা সরকারি পর্যটন দপ্তরের (KTDC) মাধ্যমে |পর্যটকরা ইচ্ছা করলে এদের সাথে যেতে পারেন | খরচ সাধ্যের মধ্যে |

কলকাতায় এদের অফিসের ঠিকানা :

Dakshinapan Shopping Complex, 2, F – 57, Gariahat Rd S, Dhakuria, Babu Bagan, Jodhpur Park, Kolkata, West Bengal 700068 ফোন নম্বর : 033 6536 7190

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *