Famous Flamingos

কিংবদন্তী কন্যাকুমারী !

বেড়াতে যেতে কার না ভালো লাগে। কিন্তু আজকের এই ব্যস্ত জীবনে মূল অন্তরায় হচ্ছে সময়। যাই হোক,সেই বাধা অতিক্রম করে অবশেষে গত ১৯শে অক্টোবর,বিজয়াদশমীর ভোরে সপরিবারে মিলে বেরিয়ে পড়া গেল। গন্তব্য, ‘ঈশ্বরের নিজের দেশ’ কেরালা এবং ‘ভারতের মূল ভূখন্ডের শেষ’ কন্যাকুমারী। কলকাতা থেকে কোচিন পর্যন্ত সরাসরি প্লেন না পাওয়ায় আমরা চেন্নাইতে নামলাম এবং চেন্নাই সেন্ট্রাল থেকে একরাত্রি ট্রেনজার্নি করে পরের দিন ভোরে এর্নাকুলামে(অর্থাৎ কোচিন) পৌঁছলাম। সেখান থেকেই মূলত আমাদের সফর শুরু হল। একে একে কোচিন-মুন্নার-পেরিয়ার-আলেপ্পি দেখে এবং প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য প্রাণ ভরে উপভোগ করে পাড়ি দিলাম কন্যাকুমারির উদ্দেশ্যে। নারকেল গাছের সারি আর তার ফাঁক দিয়ে মাঝেমধ্যে দৃশ্যমান সমুদ্র দেখতে দেখতে ২৬৪ কিমি. পথ গাড়িতে যেতে কিছুটা কষ্ট হলেও সেই জার্নি ছিল খুবই উপভোগ্য।
ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল ৫টা বাজতে যায়,আমাদের গাড়ি “হোটেল সি ভিউ” র সামনে এসে থামল। সব Formalities শেষ করে আমাদের জন্য বরাদ্দ ‘Twins Room’ র (একটা Double Bedroom র ভেতর আরেকটা Double Bedroom, মূল দরজা একটাই ) ভেতর ঢুকেই সোজা চলে গেলাম ব্যালকনিতে,সেখান থেকে তিন সমুদ্রের সঙ্গম ও বিবেকানন্দ রক – ১৩৩ ফুট উঁচু বিখ্যাত তামিল সন্ত কবি থিরুভাল্লুভারের মূর্তি যেন হাত বাড়ালেই কাছে।

অপলক দৃষ্টিতে বিকেলের পড়ন্ত রৌদ্রে সেই দৃশ্য উপভোগ করতে লাগলাম।

কিন্তু বাঙালির পায়ে তো সর্ষে,যতই জার্নির কষ্ট হোক সেই দৃশ্য দেখে আবার বেরিয়ে পড়া গেল ৩০০০ বছর পূর্বে ভগবান পরশুরাম কর্তৃক নির্মিত কন্যাকুমারী মাতার (এখানকার স্থানীয় লোকদের ভাষায় ‘আম্মান’) মন্দিরের উদ্দেশ্যে,এবার অবশ্য পায়ে হেঁটে। কেউ কেউ বলেন এই মন্দির নাকি ৫১ সতী পীঠের একটি (Wikipedia ও তাই বলে),কিন্তু তা একেবারেই নয়।কথিত আছে এক কুমারি বালিকা তথা দেবী কন্যাকুমারী সমুদ্রের উপর প্রস্তরখন্ডে একপায়ে দাঁড়িয়ে ভগবান শিবকে বিবাহ করার জন্য তপস্যা করলে তাতে শিব খুশি হন এবং বিবাহ করার উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে চাইলে দেবী পার্বতী তাতে বাধা দেন। ফলে মাতা কন্যাকুমারী লগ্নভ্রষ্টা হন এবং রাগে-অভিমানে রান্না করা সমস্ত খাবার ফেলে দেন।

মন্দিরের সামনের প্রস্তরখন্ডগুলি নাকি সেই খাবারের অংশ বলা হয়।

যাই হোক জুতো এবং জামা খুলে (এই মন্দিরে পুরুষদের খালি গায়ে প্রবেশ বাধ্যতামূলক) মন্দিরে প্রবেশ করলাম। কিন্তু একি!!!!জনপ্রতি ২০ টাকা প্রণামী (টিকিট বলা ভালো) না দিলে নাকি মন্দিরে ঢোকা যাবেনা,কি আর করা যাবে তাই দিয়ে মন্দিরে ঢুকলাম। সূউচ্চ প্রাচীর দিয়ে ঘেরা মন্দিরটি যে বেশ পুরোনো তা দেখেই বোঝা যায়,আর মন্দিরের গায়ের ভাস্কর্যের কোন তুলনা নেই। মাতা কন্যাকুমারীকে ভক্তি ভরে পুজো দিয়ে আমরা এসে বসলাম সমুদ্রের পাড়ে।

কৃষ্ণপক্ষের দ্বিতীয়ার চাঁদের আলোয় তখন উদ্ভাসিত কন্যাকুমারির সঙ্গম।কি সেই অপূর্ব দৃশ্য!!!

“আহা! কি দেখিলাম! জন্মজন্মান্তরেও ভুলিব না”।
ঘন্টাখানেক সেখানে থাকার পর ফিরে এলাম হোটেলে।

পরদিন সকাল ৫:৩০টার মধ্যে ঘুম থেকে উঠে চলে এলাম সেই ব্যালকনিতে সূর্যোদয় দেখব বলে।লক্ষ্য করলাম আরো বহু মানুষ সেই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করার জন্য সমুদ্র সৈকতে ভীড় করেছেন। কিন্তু সবার আশা ব্যর্থ করে দিয়ে আরো বেশ কিছুক্ষণ পর সূর্যদেব দেখা দিলেন দিগন্তরেখার অনেক ওপর থেকে।

মেঘের ফাঁক দিয়ে তাঁর কিরণ বিবেকানন্দ রকের ওপর পড়তে লাগল,যেন তিনি তাঁর সব তেজ,শৌর্য,দীপ্তি দিয়ে ওই স্থানকে অভয় প্রদান করছেন।
করছেন। আর সেই মানুষটা ? একশো ছাব্বিশ বছর আগে (১৮৯২ সাল) যিনি নাকি ওই উত্তাল সমুদ্রে সাঁতার কেটে পৌঁছে গেছিলেন সেই প্রস্তরখন্ডে এবং ২৫ শে ডিসেম্বর থেকে ২৭ শে ডিসেম্বর, টানা তিন দিন ওই শিলাখণ্ডে বসে ধ্যানমগ্ন হয়েছিলেন যেখানে মাতা কন্যাকুমারী তপস্যা করেছিলেন,সেই বীর সন্ন্যাসী বিবেকানন্দের নামেই সেই স্থান আজ নামাঙ্কিত – ‘বিবেকানন্দ রক’।

স্নান সেরে ফেরিঘাটে গেলাম বিবেকানন্দ রকে যাবার লঞ্চ (মঙ্গলবার বাদে প্রতি দিন সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টে পর্যন্ত লঞ্চ চলে) ধরতে । ২০০ টাকা দিয়ে স্পেশাল টিকিট (৫০ টাকায় সাধারণ টিকিট কাটার লাইনটা ছিল বিশাল) কেটে দিনের প্রথম লঞ্চটায় চেপে বসলাম এবং ঢেউয়ে দুলতে দুলতে ৫ মিনিট পর পৌঁছেও গেলাম। রক টেম্পলের প্রবেশমূল্য ২০ টাকা। জুতো খুলে প্যাঁচানো সিঁড়ি বেয়ে যেখানে উঠলাম সেটা মন্দিরের সামনে দালান বিশেষ। দালানের অপর দিকে আছে শ্রীপদমণ্ডপম মন্দির। এখানে কাচের আধারে রক্ষিত আছে দেবী কন্যাকুমারীর পদচিহ্ন।

তা দর্শন করে মূল মন্দিরে ঢুকলাম।

ভিতরে বেদির ওপর স্বামী বিবেকানন্দের দণ্ডায়মান মূর্তি। মূল মন্দির থেকে নেমে এসে গেলাম নীচের মেডিটেশন হলে। শব্দহীন আলো আঁধারিতে ধ্যানগম্ভীর পরিবেশে শুধু ওঁ চিহ্ন থেকে ওঙ্কারধ্বণি বেজে চলেছে। অদ্ভুত সেই অনুভূতিকে যেন ঠিক ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।সেই পরিবেশ থেকে বেরিয়ে এসে প্রশস্ত চাতালে দাঁড়ালাম।সমুদ্রের প্রবল হাওয়া যেন মনের সব দীর্ণতাকে উড়িয়ে নিয়ে যায়।

সামনেই তিন মহাসমুদ্রের মিলনস্থল,তিনটে জলের তিনটে আলাদা রঙ।

কত শান্ত,কত উদার,অথচ কত গভীর। যুগ যুগ ধরে এভাবেই যেন ধর্ম,পুরাণ,ইতিহাস,প্রকৃতি,দর্শন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে ওই তিন মহাসমুদ্রের মত,যার আভাস আমরা পেলেও নাগাল পাইনা ,যে নাগাল ওই ‘বীর সন্ন্যাসী’ পেয়েছিলেন। শ্রদ্ধায়,ভক্তিতে মাথাটা নত হয়ে গেল।

জায়গাটা থেকে ফিরতে ইচ্ছা করছিল না,তবুও ফিরতি লঞ্চ ধরে ফিরে এলাম ‘ভারতের মূল ভূখন্ডে’। হোটেলে পৌঁছে ১ ঘন্টার মধ্যে লাগেজ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়লাম কোভালামের উদ্দেশ্যে। মন পড়ে রইল সেই প্রস্তরখন্ডে।

হাত দুটো জোড় করে বুকের কাছে এনে চোখ বন্ধ করে মনে মনে শুধু বললাম “অসম্ভবকে সম্ভব করার শক্তি দাও।সকলকে জ্ঞান দাও,বুদ্ধি দাও,বিবেক দাও”।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *