Famous Flamingos

কোলকাতা যেন অপরূপ নারীর গায়ে মণিমুক্তো বসানো বেনারসী শাড়ি!

১৫ই অক্টোবর ২০১৮, কোলকাতা

আবার নতুনের খোঁজে বেরোনো। নতুন শহর,নতুন রাজ্য! এবার সিকিম।

প্রতি বছরই দুর্গাপূজা শুরু হবার আগেই কোলকাতা ছাড়ি। তৃতীয়া বা চতুর্থীর দিন।
তাই বিশেষ মনকেমনের সুযোগ পাই না। শরতের হাওয়া আর কাশফুলের দোলা খেতে খেতে চলে যাই অন্য কোনো দেশে। দুগ্গা মায়ের মুখটা বিশেষ দেখা হয় না বললেই চলে। ভ্রমণপিপাসু মনকে এই বলে সান্ত্বনা দিই, ৩০ বছরেরও বেশিবার মা দুগ্গাকে দেখলাম এবার বাকি দুনিয়াটা দেখি! মানুষ তো মরণশীল তাছাড়া হাতেও খুব অল্প সময়। এতবড়ো পৃথিবীটা দেখতে গেলে অনেক সময় লাগবে। তাই মা দুগ্গাকে টাটা বাইবাই করে বেরিয়ে পড়ি অজানার খোঁজে।

এই প্রথমবার বেরোলাম ষষ্ঠীর দিন। একেবারে দেবীর বোধন দেখে। আর এই প্রথমবার মনটা ভীষণভাবে হুহু করে উঠলো। পুজো শুরুর আগেই কোলকাতা ছাড়ি বলে অতটা অনুভব করি না কী হারালাম! কিন্তু এবার যেন মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ মনে হল সবকিছু ফেলে চলে যাচ্ছি? আমার মাটি! আমার শিকড়!! আমার মা দুগ্গা!!! এরকমভাবে কোলকাতাকে আগে কখনও মিস করিনি। জানিনা পাহাড়ি ফুলের গন্ধ কাশফুলের দোলাকে ভোলাতে পারবে কিনা! তবুও বেরিয়ে পড়লাম অজানা অচেনার উদ্দেশে!

ফ্লাইট নাম্বর 6E5401 ইণ্ডিগো। সময় ছিল বিকেল ৪টে ৩৫ মিনিট। এমনিতে প্লেন ছাড়ার দু’ ঘণ্টা আগে এয়ারপোর্টে পৌঁছাতে হয়, মানে দুপুর ২টো ৩৫ মিনিটে। আমাদের বাড়ি থেকে এয়ারপোর্ট যেতে সময় লাগে দেড় ঘণ্টা।পুজোর ভিড়ে ফ্লাইট মিস করার ভয়ে বাড়ি থেকে বেরোলাম সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে। কিন্তু ভিড় তো ছিলই না বরং অন্যান্য দিনের চেয়ে একটু বেশিই খালি ছিল রাস্তা। হয়তো সবাই দুপুরে ভালো করে ঘুমিয়ে রাতে ঠাকুর দেখার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেইকারণেই এয়ারপোর্টে পৌঁছে গেলাম ১টা ১৫ তে। সিকিউরিটি চেকিং হয়ে গেল খুব তাড়াতাড়ি। হাতে অফুরন্ত সময়! এই সময়টা আমার ভীষণ বিরক্তিকর লাগে। সময় কাটতেই চায় না । সত্যি বলতে কী আমার প্লেন-এ চড়তে ভালো লাগে না । ট্রেনে আমি অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। প্লেন চড়ায় কোনো বৈচিত্র্য নেই। শুধুমাত্র মাটি ছেড়ে ওড়ার আর মাটি ছোঁয়ার সময়টায় প্লেনের জানলা দিয়ে উপর থেকে শহরটা অসাধারণ লাগে! এটুকু সময় বাদ দিলে বাড়ির সোফায় বসে থাকা আর প্লেনের সিটে বসে থাকা একই। বৈচিত্র্যহীন সফর! ট্রেন এর টিকিট না পাওয়ায় প্লেনেই তাই যেতে হল। আজ এয়ারপোর্ট এ বড়ো বেশী ভিড়। পুজোর ছুটিতে বাঙালির ভ্রমণপিপাসু মন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠাই এর একমাত্র কারণ! এত লোকের সমাগম আমি এয়ারপোর্টে এই প্রথম দেখলাম। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার ইতি টেনে শেষমেশ প্লেনে ওঠার ডাক পেলাম। ফ্লাইট ১০/১৫ মিনিট লেট ছিল। ভাবলাম যাকগে খুব একটা দেরি হবে না।

প্রতিবারের মতো একইভাবে প্লেন ছাড়ল। আমি সবসময় জানলার ধারের সিট নিই, প্লেন ওড়ার আর নামার সময় শহরটাকে উপর থেকে দেখবো বলে।

প্লেনটা যখন রান ওয়ে থেকে দুরন্ত গতিতে ছুটে চলেছে তখন সূর্যাস্ত হচ্ছে। আকাশটা আবীর রঙে রাঙা।প্লেনের একটা পাখার ফাঁক থেকে ডুবন্ত সূর্যের একফালি চোখে পড়ছে !

উফফফ কী অসাধারণ দৃশ্য। ডুবন্ত সূর্যকে সাক্ষী রেখে ছুটে চলেছি দুর্বার গতিতে।

প্লেনের আকস্মিক গতি পরিবর্তনে আমার ভাবনায় ছেদ পড়ল! প্লেনটা হঠাৎ করে থেমে গেল যা এর আগে কখনো হয়নি। পাইলট ককপিট থেকে বললেন, প্লেনের তেলে ঘাটতি ঘটায় আবার প্লেন সেই স্টার্টিং পয়েন্ট এ যাবে…তেল নেবে…তারপর যাবে! অদ্ভূত অভিজ্ঞতা!! যেন অলিম্পিক দৌড়বাজদের অর্ধেক রাস্তা ছোটার পর আবার বলা পুনরায় স্টার্টিং পয়েন্ট-এ যাও…গিয়ে আবার ছোটো! এমন অদ্ভূত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়ে হাসি পেল কিন্তু হঠাৎ মনে হল প্লেনটা আকাশে ওড়ার পর যদি এমনটা হতো তাহলে কী হতো ! ভাবতেই হাসিটা মিলিয়ে গিয়ে ভয় আর বিরক্তি জন্মাল মনে। পাক্কা ১ ঘণ্টা সময় নিল প্লেন পেটপুরে তেল খেতে। বিরক্তি আর ধৈর্য চরম সীমায় চলে যাচ্ছিল।

হঠাৎ মনে হল আকাশ তো এখন অন্ধকার! তখন প্লেন উড়লে আকাশে আলো থাকতো। কিন্তু এখন অন্ধকার আকাশ থেকে পুজোর কোলকাতা দেখতে পাবো! যেটা ঠিক সময় প্লেন ছাড়লে পেতাম না।

সত্যি তাই! ভরপেট খেয়ে পরিতৃপ্ত বাঘের মতো প্লেনটা যখন মাটি ছেড়ে আসতে আসতে আকাশের দিকে যাচ্ছে আমি চোখ রাখলাম প্লেনের জানলায়।

পুজোর আলোয় রঙিন কোলকাতাকে অন্ধকার আকাশ থেকে মনে হচ্ছে যেন কোন অপরূপ নারীর গায়ে মণিমুক্তো বসানো বেনারসী শাড়ি! এতো রূপ আমার কোলকাতার !

মনটা ভরে গেল। এতো লাখ টাকার পাওনা!! একটু আগেই যে লোকটাকে (পাইলট ) মনে প্রাণে গালিগালাজ করছিলাম মনে হল তাকে কুর্নিশ জানাই। দেখতে দেখতে চোখ ধোঁয়া হয়ে গেল। কিছুটা মেঘে কিছুটা আবেগে। দীর্ঘ প্রশান্তির নিশ্বাস ফেলে চোখ বুজলাম। মনে মনে বললাম ‘ ভালো থেকো কোলকাতা ‘!

3 Replies to “কোলকাতা যেন অপরূপ নারীর গায়ে মণিমুক্তো বসানো বেনারসী শাড়ি!”

  1. আমি এই লেখাটি পড়ে সত্যিই মুগ্ধ হলাম। আমার ও এখন আর খুব একটা কলকাতার দুর্গাপূজা দেখা হয় না । সেই সময়টা বাইরেই থাকতে হয় নানা কাজে।তাই এই লেখা টির সাথে আমার নিজের বর্তমান অবস্থার অনেক মিল খুঁজে পেলাম। আর ও এই ধরনের মনোমুগ্ধ কর লেখা আমি পড়তে চাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *