Famous Flamingos

মায়াবী ইয়াকসাম !

“আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া
বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সারা”

রবীন্দ্রনাথের এই চিরস্মরণীয় বাণীকে বুকের মাঝে জাগিয়ে রেখে ভ্রমণপিপাসু মনকে তৃপ্ত করতে এবারের গন্তব্য’ইয়াকসাম’।

ইয়াকসাম….., সিকিমের প্রথম রাজধানী, পশ্চিম সিকিমের গেজিং সাবডিভিশনের একটা ছোট্ট জনপদ।১৬৪২ খ্রিস্টাব্দে প্রথম চোগিয়াল (রাজা)ফুন্টসগ নামগিয়াল এটি স্থাপন করেন।তিব্বতি ভাষায় ইয়াকসামের অর্থ তিন পুন্যাত্মার (লামা) মিলনস্থল।

পাহাড়ে ঘেরা অপুর্ব নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই ছোট্ট জায়গাটা প্রকৃতিপ্রেমীদের মনের রসনা-বাসনাকে পূর্ন মাত্রায় চরিতার্থ করার ক্ষমতা রাখে।
ইয়াকসাম এর নির্মল নির্জন নিস্তব্ধতায় মনটা কে প্রকৃতির মধ্যে ডুবিয়ে দিতে দিতে মনে হয় এমন জায়গায় এসে সব ভুলে থাকা যায়, জীবনের সব জ্বালা যন্ত্রনা, টেনশন,রাগ, অভিমান,দুঃখ কষ্ট সব।প্রকৃতির মতোই সুন্দর এখানকার মানুষজনের ব্যবহার,তাদের আতিথেয়তা আপনাকে মুগ্ধ করবেই।

নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরে ইয়াকসাম নামে পশ্চিম সিকিমের এই ছোট্ট গ্রামটি ট্রেকার দের কাছে অতি পরিচিত একটি নাম।

বলতে দ্বিধা নেই প্রথমে যখন এই ট্যুর এর প্ল্যান করছিলাম তখন ইয়াকসাম এ আসার কথা ছিল না।পরবর্তীতে নেট ঘেঁটে এর সন্ধান পেয়ে একরাত এখানে থাকার প্ল্যান করে ফেললাম।আমার সফরসঙ্গী আমার স্ত্রী ও মেয়ে।
আমাদের এই ট্যুরটা তে প্রথম দুদিন রাবঙলা একদিন ইয়াকসাম একদিন পেলিং আর একদিন রিনচেনপং থেকে এন জি পি ফেরার কথা।। নিশ্চই ভাবছেন বাকি জায়গা গুলো ছেড়ে শুধু এই জায়গাটা নিয়ে কেনো বলছি।তার অবশ্যই একটা নির্দিষ্ট কারণ আছে।বাকি জায়গা গুলোতে(রিনচেনপং বাদে) প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে সাথে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য মানুষের বানানো কিছু স্থাপত্য মায় কৃত্রিমতা আছে ,যেমন রাবঙলার বৌদ্ধ পার্ক,পেলিং এর স্কাই ওয়াক, মোনাস্ট্রি,যা সত্যিই অতুলনীয় ,কিন্তু মানুষ সেটাকে তার প্রযুক্তি ও বুদ্ধিমত্তার দ্বারা পর্যটকদের কাছে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে,কিন্তু ইয়াকসামে শুধু তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভান্ডার ছাড়া আর তেমন কিছুই নেই।যারা গোয়েচালা বা জংরি ট্রেকিং করেন তাদের কাছে ইয়াকসাম হলো শেষ জনপদ।এরপর আর কোনো মানুষের বসবাস নেই,শুধু পায়ে চলা ছাড়া কোনো যানবাহনও অমিল।প্রয়োজনীয় যা কিছুর অভাব মেটানোর শেষ জায়গা তাদের কাছে এই ইয়াকসাম।

রাবঙলা (দক্ষিন সিকিম)থেকে যখন ইয়াকসামের (পশ্চিম সিকিম)উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম তখন রাবঙলা তে স্নো-ফল শুরু হয়েছে।পথে পাহাড়ের গায়ে কাঠের তৈরী হ্যাংগিং ছোট্ট একটা দোকানে স্থানীয় মোমোর স্বাদ নিতে নিতে প্রকৃতি দেখার অভিজ্ঞতা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।পাহাড়ি পাকদন্ডী বেয়ে ইয়াকসামে গাড়ি যখন পৌঁছাল তখন বেলা ১২ টা বাজে।অসহ্য রকমের একটা ঠান্ডা হাওয়া আমাদের হাত পা প্রায় অবশ করে দিচ্ছিলো।স্থানীয়রা বলাবলি করছিলো যে আজ বরফ পড়তেও পারে।বরফ পড়ার আগে নাকি এমন আবহাওয়া তৈরি হয়।এমনিতেই ডিসেম্বরের শেষের দিকে এই সময়টাতে ঠান্ডা একটু বেশিই থাকে।

আমাদের জন্য নির্ধারিত হোটেলটা ভারী সুন্দর ছিলো।রাস্তার ধারে পাহাড়ের কোলে সাজানো গোছানো অ-বৃহৎ চমৎকার হোটেল।

লাগেজ ঘরে রেখে তৎক্ষণাৎ গাড়ি নিয়ে কাছের কথথক লেক দেখে হেলিপ্যাডে চলে এলাম। জায়গাটা অসম্ভব রকম সুন্দর,চারদিকে উঁচু পাহাড়ের মাঝে হেলিপ্যাড এর পরিবেশ মন কে বহুক্ষণ আবিষ্ট করে রাখবে। দূরে সবকটা পাহাড়ের চূড়া বরফে সাদা হয়ে আছে।

বেশ কিছুক্ষন ফটোশুট করার পর ক্ষিদেটা বেশ অনুভূত হল।আগে থেকে হোটেলে লাঞ্চ বলা না থাকায় বাইরে রেস্ট্রুরেন্ট এ খেতে হবে।রাস্তার ধারে গুপ্তা রেস্ট্রুরেন্টএ লাঞ্চ করার সময় হঠাৎ চরিদিকে চেঁচামেচি শুনে বাইরে এসে দেখি স্নো-ফল শুরু হয়েছে।বিচ্ছিরি রকমের ঠান্ডার কারণটা এবার বোঝা গেলো।হঠাৎ স্নো ফলের জন্য জঙ্গলের মধ্যে গা ছমছমে পরিবেশে প্রায় ৪৫ মিনিট হেঁটে দুবদি মোনাস্ট্রি দেখার প্ল্যান টা ভেস্তে গেলো।হোটেলে ফিরে নিচের ফায়ার প্লেসে বেশ কিছুক্ষণ হাত পা সেঁকে নিলাম।রাতের হাড় কাঁপানো ঠান্ডার আন্দাজ পেয়ে আগে থেকে হোটেলেই ডিনারের অর্ডার দিয়ে রাখলাম।

পরদিন সকালে উঠে প্রত্যাশামতো চারিদিকে হাল্কা বরফের আস্তরণ চোখে পড়ল।কাছাকাছি সব পাহাড়ের গাছ গুলোর মাথা ঝুরো ঝুরো বরফে সাদা, দূরে সকালের সূর্যের আলোয় বরফ ঢাকা উজ্জ্বল পাহাড়ের চূড়া দেখে মন ব্যাকুল হলো। জিজ্ঞাসায় জানলাম ওটা মাউন্ট কাব্রু। এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা আর কাব্ৰু এই দুই শৃঙ্গ দৃশ্যমান।বরফ-হাওয়া তখন হাত কে এমন অবশ করে ফেলেছে যে ভালো ভাবে ছবি তোলাও কষ্টসাধ্য।

ব্রেকফাস্ট সেরে কাছের ‘থ্রোন অফ নরবুগাঙ’ দেখতে গেলাম।কিংবদন্তি পাইন গাছের নিচে মাটি ও পাথরের গড়া প্রথম চোগিয়ালের(রাজার) করোনেশন থ্রোন এখনো আছে। প্রথম রাজার রাজ্যাভিষেকের পর(১৬৪২)প্রথম এই সিংহাসনে বসেন।অসম্ভব শান্ত সুন্দর সেই পরিবেশে একটা ঐতিহাসিক শিহরণ অনুভূত হয়।লাগোয়া প্রায় জনমানবহীন অথচ খুবই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন একটা মোনাস্ট্রি দেখে মন ভরে গেলো।

যখন ফেরার সময় হলো তখন বুঝলাম যে এতক্ষণ একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম।ইয়াকসাম তার অপরূপ সৌন্দর্য্যের মাদকতায় আমাদের সম্পূর্ণ ভাবে আচ্ছন্ন করেছিলো। ইবন বতুতার একটা বিখ্যাত উক্তি মনে পড়ল-“ভ্রমণ প্রথমে তোমায় নির্বাক করে দেবে তারপর তোমায় গল্প বলতে বাধ্য করবে”। পরবর্তী গন্তব্য পেলিং হলেও হলফ করে বলা যায় এমন মায়াবী পরিবেশ মেলা দুস্কর।ভবিষ্যতে কোনোদিন অন্তত দুটো দিন থাকার শপথ নিয়ে ইয়াকসাম কে বিদায় জানালাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *