Famous Flamingos

মেঘ পিওনের দেশে!

রাস্তা বাঁকে পাহাড়ি ঝোরা

মন নিয়ে চলে সাথে

এ তো রডোডেন্ড্রনের দেশ 

লাল নিশান পড়ে থাকে পথে। …

পাহাড় আমার কাছে শুধু একটা ঘুরতে যাওয়ার ঠিকানা নয়, পাহাড় মানেই নেশা। হারিয়ে যাওয়ার নেশা।  রোজকার কর্ম মুখর ব্যস্ততার দিনগুলো থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে একছুটে দমকা বাতাস এর পিছু ধাওয়া করার নামই হলো পাহাড়। হ্যাঁ, পাহাড়ের গন্ধে সেই মাদকতা আছে যার জন্যে কোনোদিন-ই সেই হাতছানি গুলোকে উপেক্ষা করতে পারি না।  এবারের গন্তব্য ছিল ওল্ড সিল্ক রুট। 

নির্ধারিত দিনে চেপে বসলাম কামরূপ এক্সপ্রেসে , খুব শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি , তাই অগত্যা অন্য ট্রেন পাওয়ার আশা আমাদের ছিলও না। পরদিন পৌঁছালাম  নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন। সেখান থেকে আরিতার। যাওয়ার পথে দামাল তিস্তার বুকে রাফটিং ছিল অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা। ক্রমশ সিকিমের পথে এগোলাম আমরা। পাহাড়ি পথের ইতিউতি উঁকি দিচ্ছে রডোডেনড্রন। যদিও সিকিমে বসন্তেই ঘটে রডোডেন্ড্রনের মহাসমাহার। তবুও অতি স্বল্প হলেও ওই লাল,গোলাপি,সাদা রং গুলোর অমোঘ আকর্ষণকে কোনো কালেই উপেক্ষা করা সম্ভব হয় না আমার পক্ষে। ওরা যেন সারি দিয়ে পাহাড়ের রুক্ষতা অমলিন করে জ্বলজ্বল করতে থাকে।

এই ওল্ড সিল্ক রুটের খুব পরিচিত কিছু স্থান আছে যেগুলো ঘুরে জুলুক পৌঁছানো যায়। সেই সব ভ্রমণ বৃত্তান্ত না হয় অন্য একদিন শোনাবো। আজ ফিরে আসা যাক মূল গন্তব্যে ভ্রমণের কথায়। জুলুক পৌঁছে রাতটা কাটালাম পাহাড়ের কোলে খুব ছোট্ট একটি হোমস্টেতে।এই রুটে হোমস্টেগুলোই মূল ভরসা। এখানে যে আতিথেয়তা পাওয়া যায় তা শহরের অনেকই বড়ো ঝাঁ চকচকে হোটেলকেও হার মানায়।  পরদিন সকালে উঠে রওনা দিলাম সিল্ক রুটের উদ্দেশে। জুলুক থেকে ক্রমশ সাপের মতো আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে উপরে উঠছি , চারপাশটা বদলাতে থাকছে। আমরা গেছিলাম ডিসেম্বর এর শেষে , তাই শীত বেজায় ছিল। আর তার সাথে ছিল এতো পরিষ্কার আবহাওয়া যা বোধহয় খুব কম পাওয়া যায়।  ক্রমশ দেখলাম মাথার উপরে থাকা মেঘগুলোকে কখন যেন ভেসে ভেসে নিচে চলে যেতে, না হয়তো ভুল বললাম।

সিল্ক রুট

আমরাই মেঘের দেশ পেরিয়ে আরো উপরে উঠে পড়েছি।  সে এক অপার্থিব অনুভূতি, যখন দেখছি চারপাশের আর পায়ের তলার মেঘগুলো যেন বিশাল সমুদ্রের মতো ঘিরে রয়েছে আমাদের। আর আকাশের রং ? সেটা না বললে অনেক কিছুই বোধ হয় না বলাই থেকে যায়।  এত্ত গাঢ় নীল ! এও কি সম্ভব ? এই নীল যে আমার ভীষণ প্রিয়! বড়ো ভালো লাগার রং। ওই রঙের মুগ্ধতা কাটিয়ে ওঠার আগেই যা চোখে পড়লো তা বোধ হয় ভাষায় বর্ণনার অতীত।  একটা পাহাড়ি বাঁক পেরিয়েই এসে পৌঁছলাম থাম্বি ভিউ পয়েন্টে। গাড়ি থেকে তখন নামতে পারিনি।  চোখের সামনে যা দেখলাম, থাক সেটা না হয় নীচের ছবিটাই বলে দেবে..

মনোমুগ্ধকর কাঞ্চনজঙ্ঘা !

 কাঞ্চনজঙ্ঘা। এতো মনোমুগ্ধকর বোধ হয় দার্জিলিং বা পেলিং থেকেও দেখিনি।অনেকেই  আমার সাথে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন, কিন্তু আমার এখনো পর্যন্ত দেখা জীবনের সেরা দৃশ্য বোধ হয় ওটাই ছিল। ঝলমলে আকাশ আর তার থেকেও ঝলমলে পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ, মেঘরাশির ওপরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। হ্যাঁ, এই সেই হিমালয় যা যুগযুগ ধরে আমাদের মতো ভ্রমণ পিপাসুদের দুচোখকে সার্থক করে আসছে।  এই আবেগ অবর্ণনীয়।  চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এলো। 

ক্রমশ আরো উপরে উঠতে থাকলাম।একে একে লুংথুঙ, বাবা মন্দির , কুপুপ লেক ঘুরে নেমে এলাম নাথাং উপত্যকায়। সামান্য বরফ পেয়েছিলাম রাস্তায়।  এই নাথাং-এ একরাত থাকার কথা আমাদের।  পাহাড়ের কোলে ছোট্ট একটা গ্রাম যার উচ্চতা ১৩৫০০ ফুট । নাথাং যখন পৌঁছলাম তখন বিকেল প্রায় হয়ে এসেছে, চারিদিক ঘুরে দেখার সময় ও তখন শেষ। রাতটা কাটিয়ে পরদিনের গন্তব্য ছিল ঋষিখোলা।  ওই উচ্চতায় থাকার অভ্যাস না থাকায় রাতে সবারই কম বেশি শ্বাসকষ্ট হয়েছে।

নাথাং উপত্যকায় সূর্যোদয় !

তবে পরদিনের সূর্যোদয় সেইসব কষ্টকে নিমেষে ভুলিয়ে দিয়েছে। আমাদের ভাগ্য হয়তো সে যাত্রায় খুবই সহায় হয়েছিল তাই আমরা নাথাং উপত্যকায় থাকতে পেরেছি। তুষারপাতের পর থেকেই রাস্তা বন্ধ হয়ে যায় তখন ভ্রমণার্থীরা সেইভাবে এই উপত্যকাকে উপভোগ করার সুযোগ পায় না।  যাইহোক নাথাং উপত্যকার সকালটাও ছিল সত্যি উপভোগ্য। বলাই বাহুল্য বাথরুমের সমস্ত জলের নল জমে গিয়েছিল এবং অবশেষে বরফ ভাঙতেও হয়েছিল।  এইসব ছোট ছোট ঘটনাগুলোই খুব সুন্দর স্মৃতি হয়ে থেকে যায় মনের মণিকোঠায়। 

এই নিস্তব্ধতা , আচ্ছন্নতা কাটিয়ে পাহাড়ি উপত্যকা ছেড়ে যেতে মন একেবারেই চাইছিল না। কিন্তু সময় আর ব্যস্ততা বাধ্য করে ফিরে আসতে।  প্রত্যেকবার পাহাড়ে যাই., অনেক স্মৃতি জমা রাখি আর সেগুলো নিয়ে ফিরে আসি সমতলে।  কিন্তু এবারের স্মৃতি সত্যিই বড়ো অন্যরকম। ‘ কাঞ্চনজঙ্ঘা ‘ এই নামটুকুর মধ্যে যে আবেগ লুকিয়ে রয়েছে সেই আবেগকে যেন বুকে জড়িয়ে নিয়ে ফিরলাম।  পান্ডিম, কাব্রু থেকে ইয়াংলুথাঙ। সব শৃঙ্গ গুলোই খুব পরিষ্কার, খুব স্বচ্ছ ভাবে চোখের সামনে আজও ভাসে।  এই অনুভূতিগুলোকেই আগামীতে পথ চলার অনুপ্রেরণা করে পরদিন ঋষিখোলা ঘুরে, ফেরার ট্রেন ধরলাম।  সিকিমকে বললাম আবার আসবো, বারবার আসবো। আর কোন্ রাজ্যই বা এমন সুন্দর স্বচ্ছভাবে আমাদের হিমালয় উপহার দেয়? সিকিম পূর্ব, সিকিম পশ্চিম ঘোরা হয়েছে, এরপর হয়তো উত্তর আর দক্ষিণের পালা। আশায় বুক বাঁধলাম। আবারও ফিরবো পাহাড়ের কোলে, হারাবো পথ রডোডেন্ড্রনের দেশে !!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *