Famous Flamingos

সারান্ডার জঙ্গলে একরাত্তির !

ভোর পাঁচটার মোবাইলে অ্যালার্ম বাজতেই ঘুম থেকে উঠে সোজা বাথরুমে। আজ দেখতে পেলাম একটা কল কাজ করছে না। কাল আসা থেকে এসব দেখার সময় পাইনি। বর্ষার জঙ্গলে একা একটা রাত কাটাবো বলে গতকাল ভোরের হাওড়া-বারবিল জনশতাব্দী ধরে দুপুর দেড়টার মধ্যে সটান এখানে। মানে ‘সারান্ডা সাফারি রিসোর্টে’। উড়িষ্যা -ঝাড়খন্ড বর্ডারে অবস্থিত সারান্ডার জঙ্গলের একেবারে মাঝখানে এই বন্দোবস্ত। বারবিল হয়ে আসাই সুবিধা।

চেক-ইন করে দুপুরের স্নান খাওয়া চট করে সেরেই চললাম ২২ কিলোমিটার দূরের ‘পাঁচরী জলপ্রপাত’ দেখতে। মনে পড়ে গেলো বুদ্ধদেব গুহর লেখা কিরিবুরু মেখাতাবুরুর কথা! এ হল সেই কিরিবুরুর একেবারে দোরগড়ায়…পাহাড়ের মাথায়। সমতলের রাস্তা ছেড়ে পাহাড়ী পাকদণ্ডী বেয়ে ড্রাইভার সন্তোষের হাতে বোলেরো জিপ তখন উন্মত্ত সাপ! যেখানে দাঁড়ালাম সেখানে নেমে আরও উপরে উঠতে হবে। অগত্যা পাহাড় চড়া শুরু হল। সন্তোষ সামনের জংলি লতাপাতা সরিয়ে পোকামাকড়, মাকড়শার জাল, সাপ বা অন্য বন্যপ্রাণীর ভয়ডর না করেই আমার জন্য পায়ে চলার রাস্তা তৈরি করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিল। আর আমি ওর পিছনে পিছনে যাচ্ছিলাম DSLR হাতে। এখানে কোনো গাড়িতে জঙ্গল সাফারি হয় না। তাই একে বলে ‘ভারজিন ফরেস্ট ’ !

কিছুটা গিয়ে বাঁক নিতেই দেখি উপর থেকে ‘ পাঁচরী জলপ্রপাত ’ পাথরের ধাপে ধাপে নেমে এসেছে। ঠিক যেন শিবের মাথা থেকে গঙ্গা নামছে। জল বেশ ঠাণ্ডা! মুখে হাতে দিয়ে ক্লান্তি বেশ কিছুটা কাটালাম।


পাঁচরী জলপ্রপাত

অন্য পাকদণ্ডী রাস্তা বেয়ে নেমে চললাম সূর্যাস্ত দেখতে। লোহা মিশ্রিত লাল পাথুরে মাটিতে দাঁড়িয়ে কিরিবুরু পাহাড়ের মাথায় অপরূপ ধূসর এক সূর্যাস্ত দেখলাম!

ফেরার পথে চা খাব বলে ছোট্ট জনপদে দাঁড়িয়ে জিরোলাম কিছুক্ষণ। রিসোর্টে ফিরে ধুমায়িত গ্রীন-টি এর সাথে গরম ফুলুরি আর পিঁয়াজি জমে গেলো! মিনিট কুড়ির একটা বিরতি। আবার বেরিয়ে পড়লাম রাতের সারান্ডা দেখবো বলে। যাকে বলে নাইট সাফারি !

এবারে সঙ্গি চালক ইন্দ্র। সে রাতের জঙ্গলের পথ দেখানোর জন্যই বিখ্যাত। সার্চ লাইট নিয়ে সুমিত গাড়ির পিছনের সিটে। আমি সামনের বাঁদিকে বসে দুধ সাদা আলোর এলিডি টর্চটা বের করে ‘ অ্যানিম্যাল স্পটিং ‘ শুরু করে দিলাম। গহীন বনের নিশ্ছিদ্র ঘন অন্ধকার চিরে খানখান হয়ে যাচ্ছে টর্চের আলোয় ! ইঞ্জিন বন্ধ করতে বললাম ইন্দ্রকে।

চাঁদনী আলোতে মহুয়া গাছের তলায় দাঁড়িয়ে থাকা ‘ বারকিং ডিয়ার –এর’ ডাক শুনতে পেলাম। কাছাকাছি বাঘের অস্তিত্ব টের পেলে ওরা এরকম আচরণ করে ! চিতা তো আছেই এই জঙ্গলে ! একনাগাড়ে ডাকছে দেখে আমি আর ইন্দ্র গাড়ি থেকে না নেমে পারলাম না।

কিন্তু টর্চ মারতেই সে সটান একলাফে জঙ্গলে ঢুকে গেলো। ফেরার সময় কোটারী আর খরগোশ দেখলাম আমাদের গাড়ির সামনে দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে চলে যেতে।

হঠাৎ এক জায়গায় এক প্রাণীর উপস্থিতি দেখে আবার নেমে পড়লাম গাড়ি থেকে। গিরগিটির থেকে বড় কিন্তু গোসাপের থেকে ছোট ও চ্যাপ্টা… গায়ের রঙে অজগরের কাছাকাছি এক সরীসৃপের দেখা পেলাম।

রিসোর্টে এসে ইন্টারনেটে গুগুল সার্চ করে জানতে পারলাম সেটা ছিল ‘ তক্ষক সাপ’ যার লালা দিয়ে তৈরি করার চেষ্টা চলছে কান্সারের জীবনদায়ী ওষুধ।

সকালে উড়িষ্যার এই দিকটা বেশ ঠাণ্ডা। ডায়নিং এ মঙ্গল আমার জন্য গ্রীন-টি বানাতে বানাতে বলল,’ সাব জলদি লিজিয়ে সুরাজ উঠনে সে পেহেলে জঙ্গল পউছনা হোগা…খরগোশ নেহি মিলেগা’। দু চুমুখে চা শেষ করে হান্টার বুটটা গলিয়ে রিসোর্টের পিছন দিকের কারো নদীকে সঙ্গী করে এগিয়ে গেলাম।


কারো নদীর পাড়ে

সারারাত বৃষ্টির জন্যই মনে হয় একটা বুনো গন্ধ পাচ্ছি। নদীর পাড়ে একজায়গায় আদিবাসীরা মহুয়া ফুলের রস জাল দিচ্ছে। একটা ফাঁকা জায়গায় দাঁড়াতেই হল। দূরে কিছু খরগোশদের  আস্ফালন  আবার মুহূর্তের মধ্যে তাদের ঘন জঙ্গলে মিলিয়ে যাওয়া দেখতে বেশ মজাই লাগছিল।

ফেরার সময় পায়ের কাছে পচা পাতার তলায় হঠাৎ আবিষ্কার করলাম হালকা সবুজ রঙের উপর কালো আলপনা দেওয়া পাতলা একটা সাপ । মঙ্গল বলল পা তাড়াতাড়ি সরিয়ে নিতে কারণ সাপটা নাকি খুব বিষাক্ত।

নাম না জানা সরীসৃপ

রিসোর্টে ফিরে ব্রেকফাস্ট সেরেই সন্তোষকে নিয়ে ১৮ কিলোমিটার দূরের ‘ ঝিকরি জলপ্রপাত’ দেখতে যেখানে নামলাম সেখান থেকে দেখে মন ভরল না। অতএব পাহাড়ি  জংলি রাস্তা ধরে উপরে ওঠা ! এখানে এসে বুঝলাম যে না এলে কি হারাতাম ! আমার সফরের এটাই ছিল সেরা জায়গা !


ঝিকরি জলপ্রপাত

হাওয়ায় ভেসে আসছে বৃষ্টির জলের মতো জলকণা। ভিজিয়ে দিচ্ছে সারা শরীর। তৈরি হচ্ছে রামধনুর দেওয়াল। পারলাম না ধরে রাখতে, সঁপে দিলাম নিজেকে সিক্ত হতে ! এক আদিম অথচ বন্য মাদকতায় মাতাল হলাম আমি !

ফিরতে হল ! রিসোর্টের মালিক লাতিফজির আতিথিয়তার কোন জবাব নেই। বিদায়বেলায় বৃদ্ধ লাতিফজিকে জড়িয়ে ধরলাম । আমায় বললেন ,-“ আবার আসবেন, এবার কিন্তু একা নয়, সবাইকে নিয়ে আসবেন।”

বারবিল থেকে ফিরতি ট্রেনে বসে যখন এই লেখা শেষ করছি হঠাৎ মনটা খারাপ হয়ে গেলো। ট্রেনের কামরার জানলা দিয়ে দেখা পড়ন্ত বিকেলে দূরের পাহাড়গুলো  আস্তে আস্তে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে…আর পাচ্ছিনা বৃষ্টিভেজা জঙ্গলের সেই বুনো সোঁদা গন্ধ !

সারান্ডার জঙ্গলে একদিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *