Famous Flamingos

‘শুন্য পথে’

ছোটোবেলায় রাতে প্রায় একটা স্বপ্ন দেখতাম যে আমি আকাশ পথে হেঁটে যাচ্ছি আর নিচ দিয়ে গাড়ি ঘোড়া মানুষজন যাচ্ছে আর আমি তাদের ওপর দিয়ে দিব্বি হেঁটে চলেছি।হঠাৎ নীচে যখন চোখ পড়ত একটা অদ্ভুত শিরশিরানিতে ঘুম টা ভেঙে যেত।
এমনই শুন্যে হাঁটার আর সেই শিরশিরে অনুভূতির সুযোগ পেয়ে গেলাম এবার সিকিমের পেলিং এ গিয়ে।আগেই খবর পেয়েছিলাম পেলিং এ একটা স্কাই ওয়াক হয়েছে এবং খুব সাম্প্রতিককালে সেটা পর্যটক দের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে।

যদিও এখনো অনেকে সেটার খবর জানেন না,তাই সেখানে গিয়ে ট্যুরিস্ট দের থেকে বেশি ওখানকার স্থানীয়দের ভিড় বেশি চোখে পড়ল। সত্যি বলতে কি এমন একটা অদ্ভুত বিশ্রী রকমের অবস্থার মধ্যে পড়তে হবে জানলে হয়তো স্কাই ওয়াক করার রিস্ক নিতাম না।
অসম্ভব সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য সম্বলিত চারিদিকে পাহাড়ে ঘেরা পেলিং এর স্কাই ওয়াক চত্বর।মাত্র ৫০ টাকা মাথাপিছু টিকিট কেটে পা ফেললাম স্কাই ওয়াক এর কাঁচের মেঝেতে।

কিছুটা যাওয়ার পর নিচের দিকে তাকিয়ে এমন ভয়াবহ শিরশিরানি বুক আর পেটের মধ্যে হতে লাগলো যে পা আর একচুলও নড়তে চাইলোনা। মনে হচ্ছিলো সত্যি শুন্যে হাঁটছি, স্বচ্ছ কাঁচের মেঝের মধ্যে দিয়ে নিচের পাহাড়ের ঢাল, রাস্তা,এসব দেখে পা বিদ্রোহ করল।স্থাণুবৎ অচল আমি বিস্ময়ে দেখলাম আমার মত অনেকেরই এই একই অবস্থা।কেউ কেউ ভয়ে কাঁচের মেঝেতেই বসে পড়েছে ,কেউ কেউ বসে বসে শরীরটা কে ঘষে ঘষে নিয়ে যাচ্ছে।

আমার মেয়েকে দেখলাম কাঁচের মেঝে দিয়ে নীচের দিকে একদৃষ্টে বিভোর হয়ে তাকিয়ে থাকতে। জিজ্ঞাসা করতে বলল ওর খুব মজা লাগছে।বুঝলাম পায়ের নিচের কাঁচের যে স্বচ্ছতা আমার হৃৎপিন্ডকে স্তব্ধ করে দিচ্ছে সেটাই আমার মেয়ের কাছে অনাবিল আনন্দের কারণ।

আমি আর কথা না বাড়িয়ে চারিদিকে আমার মতো ভয়ে পাংশু হওয়া মুখ গুলোর খোঁজ করতে লাগলাম।দেখলাম আমার বউ ও পাশের রেলিং ধরে আস্তে আস্তে এগোচ্ছে।বোঝা গেলো ওর ভয় লাগলেও আমার মতন নয়, অন্তত এগোতে পারছে। আমি তো না এগোতে পারছি না অতিক্রান্ত রাস্তাটুকু ফিরে যেতে পারছি।হঠাৎ দৃষ্টি গেলো আমাদের গাড়ির ড্রাইভারের দিকে,দেখলাম ও আমার মতই কিছুটা এসে রেলিং ধরে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে।জিজ্ঞাসা করাতে কাঁপা গলায় বললো “চক্কর আ রাহা হ্যায় স্যার, আগে নেহি যা সাকতে”।ছেলেটা বলে কি, সিকিমের রাবঙলার ছেলে, ভূমিপুত্র হয়েও ভয় পাচ্ছে, তাহলে আমি কি দোষ করলাম।মনের মধ্যে হওয়া লজ্জা টা এক নিমেষে গায়েব।বেশ হাল্কা ভাবে হাসতে হাসতে বললাম নিচের দিকে না তাকিয়ে চলে এসো নির্মল,ওপর দিকে তাকাও, দেখবে ভয় লাগবেনা। ‘নির্মল’ আমাদের ড্রাইভার,এ কদিনে মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছিলাম আমরা ওর সাথে।নামের মতোই নির্মল ওর মন আর মুগ্ধ করা ব্যাবহার।ওকে ওপরে তাকিয়ে আসার বুদ্ধিটা নিজেও ব্যবহার করে বাকি রাস্তাটা এভাবেই পার হলাম।

পুরোটা পার হয়ে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে চত্বরের আরেক পাশে অনেক গুলো সিঁড়ি দিয়ে উঠে বিশালাকার বুদ্ধের একটা মূর্তি দর্শন করলাম।এখানে বুদ্ধের রূপটা অন্য রকম।

ভগবান বুদ্ধের এই মূর্তির স্থানীয় নাম চেনরেজিগ(chenrezig)।১৩৭ ফুট উঁচু গগণস্পর্শী ভিন্নরূপী বুদ্ধ কে দেখে শুধু অবাক হতে হবে তাই নয়,এত উঁচু পাহাড়ের উপর বিশ্বের সর্বোচ্চ স্ট্যাচু গুলোর মধ্যে একটাকে দেখে বিস্ময়ের ঘোর কাটাতে কাটাতে মনে হবে মানুষের দ্বারা সব সম্ভব।কি ভয়ঙ্কর প্রতিকূলতার মধ্যেও এমন অসম্ভব সুন্দর শিল্পশৈলী স্থাপন একমাত্র মানুষই পারে।

বাঁধানো বিশাল চত্বরে অনেক বসার জায়গা, সেখানে বসে ১৮০° বিস্তৃত ছোট বড় নানা পর্বত শ্রেণীর মাঝে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে দেখতে দেখতে বিভোর হয়ে পড়েছিলাম।

সম্বিৎ ফিরলো নির্মলের ডাকে….

ভীষণ রকমের ঢালু রাস্তা দিয়ে গাড়িটা ধীরে ধীরে চালাতে চালাতে নির্মল বলল যে ও সামনে মাসেই ওর ফ্যামিলি কে নিয়ে এখানে আসবে।জায়গাটা ওর ও খুব ভালো লেগেছে।আমি নিশ্চিত আমার শেখানো স্কাই ওয়াক পেরোনোর কৌশলে ভর করে ওর ফ্যামিলি কে ও দিব্বি ঘুরিয়ে নিয়ে যাবে।

অপার পেলিং এর হেলিপ্যাড ছেড়ে বেশ কিছুটা ওপরে খুবই চড়াই রাস্তা দিয়ে স্কাই ওয়াক যাওয়ার রাস্তা।ভালো ড্রাইভার ছাড়া অমন মারাত্মক চড়াই রাস্তায়(যদিও রাস্তা খুবই ভালো কারণ একদম নতুন তৈরি রাস্তা) গাড়ি নিয়ে যাওয়া টা একটু রিস্কি,তবে ওখানকার ড্রাইভাররা এ বিষয়ে পটু নচেৎ হেলিপ্যাড এর কাছে গাড়ি রেখে যাওয়া ভালো। যারা পেলিং গেছেন তারা শুধু এই স্কাই ওয়াক এর জন্য আরেকবার পেলিং যেতেই পারেন।আর যারা এখনও পেলিং যাননি তাদের বলি পেলিং এ কাঞ্চনজঙ্ঘার অবাক করা নৈকট্যের এর পাশাপাশি এই স্কাই ওয়াকের মজাদার অভিজ্ঞতাও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *