Famous Flamingos

ভালোবাসা স্থির শিল্পকলা !

পুজোর ছুটি। বাতাসে শিউলির গন্ধ। পুজোয় বাড়িতে না থেকে মন ছুটে চলেছে ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যেতে। প্রেমের শহর আগ্রায়।
দিল্লি থেকে যমুনা এক্সপ্রেস ওয়ে দিয়ে তীব্র গতিতে ছুটে চলেছে গাড়ি। মসৃণ রাজপথ ধরে প্রায় তিন ঘণ্টা। মাঝে গাড়ি এসে থামল এক ধাবায়। ঝটপট ব্রেকফাস্ট সেরে আগ্রায় এসে পৌঁছালাম, সূর্য তখন মধ্যগগনে।

গিয়ে উঠলাম বেডওয়াইজার ব্যাকপ্যাকার্স হোস্টেলে। তাজমহল থেকে দূরত্ব মাত্র এক কিলোমিটার। মূলত, বিদেশী কমবয়সী ব্যাকপ্যাকার্সদের প্রিয় ডেরা। ফলত সস্তা, কিন্তু সুযোগ-সুবিধায় ষোলোআনা উজ্জ্বল। দুটো ডাবলবেড রুমের সঙ্গে ছোটদের মনপসন্দ বাঙ্করুম।

যথারীতি বাচ্চারা মহাখুশি।

দুপুরের খাওয়া সেরে দলের বাকি সদস্যরা যখন একটু বিশ্রাম খুঁজছে তখন একটা অদ্ভূত টান অনুভব করলাম। সমস্ত ক্লান্তি উপেক্ষা করে এগিয়ে চললাম তাজমহলের পূর্বফটকের দিকে। সামান্য দূরত্ব অটোতে গিয়ে দুজনে শুরু করলাম হাঁটা। হাঁটা নয় বলা যায় ছোটার থেকে একটু কম। মাথার ওপর থেকে সামান্য একটু হেলে গেছে সূর্য। গায়ে এসে লাগছে হালকা রোদের তাপ। ৫০ টাকা করে টিকিট কেটে পুরুষ-মহিলা বিভাজন লাইনে দাঁড়িয়ে পড়লাম।


প্রখর নজরদারী অতিক্রম করে এসে দাঁড়ালাম তাজমহলের প্রধান ফটকে।

বুকটা কেমন ধড়াস করে উঠল। উদগ্রীব হয়ে উঠলাম পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের এক অন্যতম প্রধান আকর্ষণকে দেখার জন্য যা আমার নিজের দেশের ঐতিহ্য। যা দেখতে গোটা বিশ্ব থেকে প্রতি বছরে প্রায় এক কোটি পর্যটক ভিড় করেন।

প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকে দু’পা এগোলেই দ্বিতীয় ফটক। যেখান থেকে দেখা যাচ্ছে শ্বেতপাথরের উজ্জ্বলতায় মোড়া সমাধিসৌধ। ছবিতে দেখা বিস্ময় চোখের সামনে।


বেশ কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে অপলক তাকিয়ে রইলাম।

শরতের গাঢ় নীল আকাশ আর মন উদাস-করা হালকা বাতাসে অনুভব করলাম ইতিহাসের গন্ধ।
স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসার এক বিরল নিদর্শন। সামনে পাথর-বাঁধানো জলাশয়। মাঝে ফোয়ারা।

প্রত্যেকটি ফোয়ারার শীর্ষবিন্দুর সঙ্গে তাজের চূড়া এক সরলরেখায় বাঁধা।

বিশ্বাস করতে পারছি না এ আমি কোথায় দাঁড়িয়ে! তাজমহলের পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে দুঃখের বন্ধুর মতো দূষণে জরাজীর্ণ যমুনা নদী। চারপাশ ঘুরে বিশাল লাইন পার করে ঢুকলাম অন্দরে।

পাশাপাশি শুয়ে আছেন ভারতসম্রাট ও তাঁর প্রিয়তমা মমতাজ। স্রষ্টার কী অপূর্ব সৃষ্টি! শত শত কারিগরের পরিশ্রম ও নিপুণ সৃষ্টির নিদর্শন এই সৌধ। অন্দরে ঢুকে পাশাপাশি শায়িত দুই সমাধি দেখে মনে পড়ে গেল সেই লাইন, ‘পাথরের ঢাকনা খুলে কখনো কি পাশে এসে মমতাজ বসে কোনোদিন?’


সন্ধ্যা নেমে আসে।

আকাশে তখন অর্ধচন্দ্র। হালকা আলো এসে লাগে তাজমহলে।
দেখার নির্দিষ্ট সময় শেষ। অনিচ্ছাসত্ত্বেও বেরিয়ে আসতে হয়। বারবার পেছন ফিরে তাকাই। কবির মতো চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে,

‘এখন নিশ্বাস নিতে পারো তুমি, নির্বিঘ্ন প্রহর
পরস্পর কথা বলো, স্পর্শ করো, ডাকো, প্রিয়তমা !
সর্বান্তঃকরণ প্রেম সমস্ত ধ্বংসের পরও
পৃথিবীতে ঠিক রয়ে যায়।
ঠিক মতো গাঁথা হলে ভালোবাসা স্থির শিল্পকলা।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *