Famous Flamingos

মাত্র ২৫০০০/- টাকায় বিদেশ ভ্রমণ !

সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি…ইউরোপ এর বিভিন্ন দেশ ঘুরলেও কেন জানিনা থাইল্যান্ড আমাকে সবচেয়ে বেশী টানে।

ওখানকার মানুষজন, ওখানকার খাবার, আর সবচেয়ে বেশী ওখানকার সমুদ্র !

তাই সময় সুযোগ পেলেই চলে যাই থাইল্যান্ড এর বিভিন্ন প্রান্তে। ব্যাংকক, পাটায়া, ক্রাবি, ফুকেট, ফি ফি, কো সামুই , কো তাও , চ্যাং- মাই , চ্যাং-রাই , পাই বিভিন্ন জায়গায় যতবারই গেছি ততবারই প্রেমে পড়েছি।

বিদেশ যেতে কে না চায় ! কিন্তু দুটো কারণে বাঙালি পিছিয়ে আসে। ১। প্রচুর খরচ ২। নতুন দেশে কি ভাবে যাব এই ভয় ! সত্যি বলতে কি প্রথম বার আমারও ভয় করেছিল অস্বীকার করব না।তবে বারবার যাবার ফলে নিজের শহরের মতই চেনাজানা হয়ে গেছে থাইল্যান্ড দেশটা।

আর সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলছি ঠিকঠাক ট্যুর প্ল্যান করলে থাইল্যান্ড ঘোরার খরচ আমাদের দেশে ঘোরার ছেয়েও কম। অবাক হলেন ? কিন্তু কথাটা ষোলো আনা সত্যি !

এই ব্লগে আমি আপনাদের মোটামুটি ৭ দিন ব্যাংকক আর পাটায়া যাবার একটা সুন্দর সফর পরিকল্পনা দিলাম সাথে প্রয়োজনীয় সমস্ত তথ্য।

সফর পরিকল্পনা সূচি দেবার আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আপনাদের জেনে রাখা দরকার।

১। ভারতের কারেন্সি যেমন টাকা থাইল্যান্ডের কারেন্সির নাম ভাট।টাকার সাথে ভাটের বিনিময় মূল্য এখন ৫০ পয়সার। মানে আমাদের ১ টাকা ওদের দেশের মূল্য হয়ে যাবে ৫০ পয়সা।

২। যেহেতু অন্য দেশ তাই আপনাকে থাইল্যান্ড এর ভিসা করতে হবে। থাইল্যান্ড এ পৌঁছেও ভিসা করানো যায় কিন্তু সেক্ষেত্রে বেশি খরচ তাই আমি সবসময় বলব নিজের দেশ থেকে ভিসা করিয়ে নেবেন। ভিসার খরচ সময় বিশেষে পাল্টায় তবে মোটামুটি ধরে নিন মাথাপিছু ২০০০/- টাকা। কিছু কিছু সময় থাইল্যান্ড এর ভিসা ফ্রী করে দেয় যেমন আমি গতবার যখন থাইল্যান্ড যাই তখন আমার ভিসা ফ্রী ছিল। তবে আমায় ভিসা থাইল্যান্ড পৌঁছে এয়ারপোর্ট থেকে করাতে হয়েছিল। অন অ্যারাইভাল (on arrival visa) ভিসা কিভাবে করাতে হয় আমি অন্য ব্লগে আলোচনা করব।

৩। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ধরতে গেলে এয়ারপোর্ট- এ ফ্লাইট ছাড়ার ৩ ঘণ্টা আগে যেতে হয়।তাই সময় বুঝে বাড়ি থেকে বেরবেন।

৪। কোলকাতা থেকে থাই এয়ার লাইনস , ইন্ডিগো, স্পাইস জেট, এয়ার এশিয়া,এয়ার ইন্ডিয়া ইত্যাদি অনেক রকমের ফ্লাইট যায় থাইল্যান্ড এ।
এয়ার এশিয়া ফ্লাইট নম্বর ১২১ এফ ডি (FD 121 Air Asia) হলো কোলকাতা থেকে থাইল্যান্ড যাবার সবচেয়ে সস্তা ফ্লাইট।
হাতে সময় নিয়ে টিকিট কাটলে আপনি থাইল্যান্ড যাওয়া আসার টিকিট ৮০০০/- টাকায় পেয়ে যাবেন। সস্তার ফ্লাইট টিকিট কি ভাবে কাটবেন এই নিয়ে আমি আমার পরবর্তী ব্লগে আলোচনা করব।

কোলকাতা বিমানবন্দর থেকে ফ্লাইট ছাড়ে রাত ১টা ৪০ মিনিটে।২ ঘন্টা ৩০ মিনিট সময় লাগে ব্যাংকক পৌঁছাতে।যেহেতু আমাদের দেশের সাথে থাইল্যান্ড এর সময় এর পার্থক্য দেড় ঘণ্টার ( থাইল্যান্ড দেড় ঘণ্টা এগিয়ে) তাই আপনি থাইল্যান্ড যখন পৌঁছাবেন তখন ওখানকার ঘড়িতে বাজবে ভোর ৫টা ৪০ মিনিট। বাকি এয়ার লাইনস এর ফ্লাইট পৌঁছায় ব্যাংককের সুবর্ণ ভূমি এয়ারপোর্ট (Suvarnabhumi Airport সংক্ষেপে BKK ) এ কিন্তু এয়ার এশিয়ার ফ্লাইট পৌঁছায় ডন মুয়াং ( Don Mueang International Airport সংক্ষেপে DMK ) নামক এয়ারপোর্ট এ।

ডন মুয়াং এয়ারপোর্ট এ নেমে আপনাকে যেতে হবে লেভেল ১ এ (floor 1) ওখান থেকে A1 নম্বর হলুদ রঙের বাসে যাবেন মো চিত (Mo Chit) বাস স্টেশান। খরচ ৩০ ভাট ( ৬০ টাকার মতো )। মনে রাখবেন মো চিত স্টেশান দুটো আছে। একটা ট্রেন স্টেশান (Mo Chit BTS ) আর একটা মো চিত (Mo Chit) বাস স্টেশান।পাটায়ার বাস ধরতে গেলে আপনাকে মো চিত বাস স্টেশান-এ নামতে হবে। ওখান থেকে পাটায়ায় বাস এর টিকিটের খরচ ১২০ ভাট ( প্রায় ২৪০/- টাকা )। মানে ব্যাংকক এয়ারপোর্ট থেকে আপনি মোট ১৫০ ভাটে ( ৩০০/- টাকা ) পাটায়া পৌঁছে যাচ্ছেন।

সকাল ৬টা থেকে রাত ১০ টা অবধি মোটামুটি ৩০ মিনিট অন্তর বাস পাওয়া যায়।
ব্যাংকক থেকে পাটায়া যেতে বাস এ সময় লাগে মোটামুটি আড়াই থেকে ৩ ঘণ্টা।

৫। থাইল্যান্ড এর বেশিরভাগ হোটেল, হোস্টেল, এপার্টমেন্ট এ চেক ইন এর সময় দুপুর ২ টো আর চেক আউট এর সময় বেলা ১২ টা। তবে রিসেপসানে ব্যাগ রেখে আপনি ঘুরতে যেতে পারেন। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি ভয় পাবার কিছু নেই আপনার ব্যাগ থেকে কিছু চুরি যাবার আশঙ্কা নেই।

৬। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষ কেনার হলে ৭/১১ বা ফ্যামিলি মারট থেকে কিনবেন।

৭। ব্যাংকক, পাটায়া বেশ গরম তাই হালকা সুতির পোশাক নিয়ে যাবেন।

১ম দিনঃ

কোলকাতা থেকে ব্যাংকক ( CCU to DMK ) ( সকাল ৫ টা ৪০ )

ব্যাংকক থেকে পাটায়ার হোটেল/ হোস্টেল/ এপার্টমেন্ট ( মোটামুটি বেলা ১২ টা )

দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে যেতে পারেন সাংচুয়ারি অফ ট্রুথ ( Sanctuary of Truth )

প্রবেশ মূল্য ৫০০ ভাট ( ১০০০/- টাকা ) আর বাচ্চাদের জন্য ২৫০ ভাট ( ৫০০ টাকা/-)। সকাল ৮ টা থেকে সন্ধ্যে ৬ টা অবধি খোলা থাকে।

রাতের দিকে ওয়াকিং স্ট্রিট এ একটু হেঁটে ঘুরে আসতে পারেন।

পাটায়ার রাস্তায় অনেক ছোট ছোট ট্রাভেল এজেন্সি থাকে। সেখান থেকে পরের দিনের কোরাল আইল্যান্ড ( Corel Island ) ট্যুর প্যাকেজ ( মোটামুটি ১০০০/- থেকে শুরু তবে আপনি কিরকম প্যাকেজ চান তার উপর খরচ নির্ভর করে ) আর রাতের অ্যালকাজার / টিফিনি শো ( ৯৬০/- টাকার মতো খরচ )এর অগ্রিম বুকিং করতে ভুলবেন না। মনে রাখবেন থাইল্যান্ড হল আমাদের কলকাতার ধর্মতলার মতো। দরাদরি করে অনেকটা খরচ বাঁচানো সম্ভব।

২য় দিনঃ

সকাল বেলা কোরাল আইল্যান্ড ( হোটেলে ফিরতে বিকেল হয়ে যাবে )

রাতে অ্যালকাজার / টিফিনি শো

৩য় দিনঃ

নং নুছ গার্ডেন (Nong Nooch Garden) সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত খোলা থাকে। প্রবেশ মূল্য ১০০০/- টাকা।

সন্ধ্যা বেলা বিখ্যাত থাই ফুট মাসাজ নিতে পারেন। খরচ ৫০০ টাকা।

পাটায়াতে দ্রষ্টব্য স্থান আরও অনেক আছে। পরের কোন ব্লগে নিশ্চয়ই সেগুলো জানাবো।

৪র্থ দিনঃ

ব্রেকফাস্ট করে ব্যাংককের উদ্দেশে রওনা দিন।
ব্যাংককে পৌঁছে লাগেজ রিসেপসানে রেখে ঘুরে আসুন ফ্লটিং মার্কেট ।( খরচ ৪০০/- থেকে ৬০০/- টাকা )

সন্ধ্যায় চলে যান ওসান ওয়ার্ল্ড (Siam Ocean World) খরচ 12০০/-)

৫ম দিনঃ

গ্র্যান্ড প্যলেস ( রাজার বাড়ি ) ৫০০ ভাট (১০০০/- টাকা তবে ভিতরে না ঢুকে বাইরে থেকে ভালই দেখা যায় আর তাতে কোন খরচ নেই ) ,

ওয়াট ফ্রা খাও (Wat Phra Kaeo) পান্নার বুদ্ধ মন্দির ,

ওয়াট ফ্রা এর রিক্লাইনিং বুদ্ধ (Wat Pho Reclining Buddha ) খরচ ২০০ ভাট (৪০০/- টাকা )

এবং ওয়াট আরুন (Wat Arun ) খরচ ৫০ ভাট (১০০/- টাকা )

সকাল সকাল বেরিয়ে পরবেন কারণ মন্দির গুলো ৩ টের পর বন্ধ হয়ে যায়।

এখানে অবশ্যই মনে রাখবেন হাত কাটা জামা,হাফ প্যান্ট বা কোন রকম ছোট পোশাক পরে মন্দিরে ঢোকা নিষিদ্ধ । তবে যথাযথ পোশাক না হলে মন্দিরের সামনে থেকে সারঙ্গ ভাড়া নিয়ে সমস্যা এড়ানো যেতে পারে।

সন্ধ্যেবেলা যেতে পারেন বিখ্যাত খাও সান রোড এ (Khao San Road)। একে “ব্যাকপ্যাকিং মহাবিশ্বের কেন্দ্র” বলে।

ওখানে বিভিন্ন রকম স্ট্রিট ফুড খেতে পারেন। শুধু এখানেই নয় থাইল্যান্ড এর সর্বত্র বিভিন্ন রকম স্ট্রিট ফুড পাওয়া যায় যা পৃথিবী বিখ্যাত।

থাইল্যান্ড এর খাবার নিয়ে না হয় পরে আপনাদের বিশদে জানাবো।

৬ষ্ঠ দিনঃ

সাফারি ওয়ার্ল্ড ঘুরে আসতে পারেন। খরচ ৬৫০ ভাট ( ১৩০০/- টাকা )

বিকেলবেলা টুকটাক কেনাকাটা করতে পারেন। ব্যাংকক কেনাকাটার জন্য পৃথিবী বিখ্যাত। তবে অবশ্যই দর দাম করবেন।

ব্যাংকক থেকে কিকি কোথা থেকে কিনবেন এ ব্যাপারে আমি অন্য ব্লগে জানাবো।

৭ম দিনঃ

এই দিনে ফেরা তাই বেশি বেড়ানো না রাখাই ভালো। সকাল বেলা উঠে ব্যাগ গুছিয়ে ব্রেকফাস্ট খেয়ে রিসেপসানে জিনিষপত্র রেখে ঘুরতে যেতে পারেন নিজের সুবিধা মতো। ব্যাংককে দ্রষ্টব্য স্থান আরও অনেক আছে। সেগুলোর মধ্যে ইচ্ছা মতো ঘুরে নেবেন শুধু মনে রাখবেন ৩ ঘণ্টা আগে এয়ারপোর্ট- এ পৌঁছাতে হবে।

ফেরার ফ্লাইট এয়ার এশিয়া ফ্লাইট নম্বর ১২০ এফ ডি (FD 12০ Air Asia) ব্যাংকক (DMK) থেকে রাত ১২টা ৫এ ছাড়ে আর কোলকাতায় এসে পৌঁছায় রাত ১ টা ৬ এ।

কোথায় থাকবেন

ব্যাংককে একা এলে ( ব্যাগপ্যাকারস দের জন্য ) খাও সান রোড ( Khao San Road )
ফ্যামিলি নিয়ে এলে সুকুম্ভিত (Sukhumvit Area)
এছাড়াও বিভিন্ন ভালো জায়গা আছে তবে যে জায়গাতেই থাকুন দেখে নেবেন B.T.S. Station এর কাছে যেন হয়। স্কাই ট্রেন এ যাতায়াত করলে খরচ অনেক কম হবে।
পাটায়ার ক্ষেত্রে বিচ রোড এর কাছে থাকবেন।
হোস্টেল : মাথা পিছু ৫০০ টাকা
হোটেল : ২০০০ টাকা ( ২ জনের )
এপার্টমেন্ট : ৩০০০ টাকা ( ৪ জনের বেশী হলে )

থাকার জায়গা কি ভাবে ঠিক করবেন আমি পরে বিশদে জানাবো।

খাওয়া খরচ

মাথা পিছু প্রতিদিন ৪০০ টাকা ধরে রাখুন ( তবে কি খাবেন তার ওপর নির্ভর করছে আপনার খরচ ! )

যাতায়াত

ট্যাক্সি ব্যবহার কম করবেন তাতে খরচ বাড়বে। স্কাই ট্রেন এ যাতায়াত করলে খরচ অনেক কম হবে। এছাড়া ওখানে স্কুটির পিছনে বসে বা টুক টুক চড়েও ঘুরতে পারেন।

অনেক কিছু জানালাম আবার অনেক কিছু বাদ পড়ল।তবু আশা করি আমার এই তথ্য আপনার কাজে লাগবে। যদি ভালোলাগে তাহলে নীচের কমেন্ট বক্স এ অবশ্যই লিখে জানান আর কিছু জানার থাকলে বা নতুন কিছু জানানোর থাকলে কমেন্ট বক্স এ লিখুন। থাইল্যান্ড সম্পর্কিত আরও অনেক তথ্য জানাবো পরবর্তী ব্লগে… সঙ্গে থাকুন। ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *